20/05/2026
হাগা-সাহেবের ট্রেন / বিশ্বদীপ চক্রবর্ত্তী
এই সুজলা, সুফলা বঙ্গদেশের একটি অখ্যাত গ্রাম গাঙ্গুরডাঙা, কাহিনির বীজ সেখানেই প্রোথিত। গাঙ্গুরডাঙার মানুষজন, তাদের গ্রাম্য রাজনীতি, আলাপ-আলোচনা, উদ্ভট কান্ডকারখানা সবকিছু নিয়েই লেখক তার গল্প ফেঁদেছেন। গ্রামের প্রধান, তার খাস মস্তানেরা (পড়ুন: সমাজসেবক), প্রচন্ড এক দারোগা, বিরোধীদলের মুখেরা, এমনকী গাছপালা এবং চারপেয়ে জীবজন্তুদের জন্যেও এই নাটকে অ্যাকশন ভরপুর, সকলেই এই উপন্যাসের বিশিষ্ট চরিত্র। এদের নিয়েই কাহিনি এগোয়। মজার মোড়কে কাহিনির কুশীলবেরা যে ঘটনার ঘনঘটার শরিক হতে থাকেন, আমার মত হতভাগা বাঙালি পাঠক যেন কিছুক্ষণ পরেই এক পরিচিত সমাজের প্রতিফলন এবং সাদৃশ্য খুঁজে পান সেইসব ঘটমান কল্পকাহিনির সঙ্গে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আরে এই তো আমার রাজ্যের জননেত্রী, জনদরদী সব সৎ নেতারা, বিরোধী দলের উত্থান এবং সেই ঐতিহাসিক পালাবদলের গপ্পো মনে হচ্ছে। পাঠক সন্দেহজনক গন্ধ পান। কাহিনি এগিয়ে চলে দুর্বার গতিতে। অ্যাকশনে ভরপুর পরপর সিকোয়েন্স, কিছু না কিছু অনবরত ঘটে চলেছে।
সুধী পাঠক, কাহিনি ধৈর্য ধরে পড়ে যান, যদিও ধৈর্যের দরকার নেই, আপনাআপনিই পড়িয়ে নেবে সব স্যাম্পেল চরিত্রেরা। শেষে আসবে 'কাহানি মে জোরদার টুইস্ট'! হাগা-সাহেবের ট্রেন, গতানুগতিক পালাবদলের স্টেশন ছুঁয়ে যাবে না, হয়তো অন্য রেললাইনের ট্র্যাক ধরবে। গল্পের নামকরণের সার্থকতাও পাঠকের মস্তিষ্কে ঢুকবে, তার শরীরের অস্বস্তিও দূর হবে। ততক্ষণে অবশ্য আপনি হাগা-নিক্সন, পেটো-পানু, প্রচন্ড দারোগা, পোধান খাসনবিস, মোম মন্ডল, জ্যান্ত কালী, কথকঠাকুর-রূপী ছিঁচকে চোর, ধান্দাবাজ ডাক্তার, কুইনিনি দেবীর প্রেমে পড়ে গেছেন, রীতিমত হাবুডুবু খাচ্ছেন। কারণ নাটকের এই কুশীলবেরা বাস্তবেও আপনার বড় চেনা পরিচিত, শেষ কয়েকটি বছরের বঙ্গ রাজনীতির এবং আর্থসামাজিক এবং ধর্মীয় অবস্থানের প্রেক্ষাপটের যে পালাবদল আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন তা আপনাকেও ঝানু করে তুলেছে।
সুখপাঠ্য এই উপন্যাসটির অন্যতম সম্বল তার ভাষা, লেখকের শব্দচয়ন তীক্ষ্ণ এবং নির্মেদ গদ্য নির্দিষ্টমাত্রায় হাস্যরসে জারিত। উপন্যাসটির প্রথম পৃষ্ঠা থেকে যে হিউমার লেখক আমাদের সামনে হাজির করেছেন, কাহিনির শেষে গিয়েও তা সমমাত্রায় বহাল, পাঠক পরিতৃপ্ত হবেন আশা করা যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে তোলার যে সার্কাস — সেই বিষয়টিকে নিয়ে ‘হাগা-সাহেবের ট্রেন’ উপন্যাসটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। সিরিয়াস কথা সিরিয়াস ভাবে উপস্থাপন করলে, লিখলে এখন বিপদ অনেক, ফ্রি ইন্টারনেটের যুগে আমরা সকলেই বড় বড় মসিহা। সেখানে সিরিয়াস বক্তব্য একটু যদি হিউমার, স্যাটায়ারের সঙ্গে গুলে, বেটে খাওয়ানো যায়, তাতে দাওয়াই-ও পড়ে, কিলটুকুও হাসিমুখে সহ্য করে নিতে হয়।
আশ্চর্যের বিষয়, লেখক তার এই লেখাটি শুরু করেছিলেন ২০১৭ সালে। কোভিড পরবর্তী সময়ে প্রায় আট-নয় বছর পর উপন্যাসটি পড়ে ভীষণ অদ্ভুত এক উপলব্ধি হচ্ছে। সাহিত্য যে আক্ষরিক অর্থেই সমসময়ের বা ভবিষ্যতের সমাজের এক দর্পণ হয়ে উঠতে পারে, উপন্যাসটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মোটের উপর, বাঙালি পাঠক ফিকশনে রাজনৈতিক স্যাটায়ারের স্বাদ সাম্প্রতিকে পেয়েছেন কিনা জানা নেই, তবে আমার স্বল্প পাঠের পরিধিতে স্বপন পান্ডার 'সিটি বুলেটিন' এর পর এমন একটি সার্থক রাজনৈতিক স্যাটায়ার পড়লাম, তাও উপন্যাস হিসেবে। কাহিনি, কাহিনির চরিত্রেরা এবং এই তীক্ষ্ণ ধারালো স্যাটায়ার খালি মনে থেকে যাবে না, বহুদিন ভাবতে বাধ্য করবে। লেখক বিশ্বদীপ চক্রবর্তী-র সঙ্গে পরিচয় ঘটল, তার লেখার মাধ্যমে।
অলমিতি।
▪️ হাগা-সাহেবের ট্রেন
— লেখক: বিশ্বদীপ চক্রবর্ত্তী
— প্রকাশক: The Antonym Collection
🖊 Joydeep Chatterjee (Joy) - https://www.facebook.com/arghya.chatterjee1