18/05/2024
#বইয়েরখোঁজ
#প্রবন্ধ
#বইয়েরপাতাথেকে
বাংলা কথাসাহিত্যর সূচনা অবশ্যই ভবানীচরণ, প্যারীচাঁদ বা কলীপ্রসন্নের কলমে। ভবানীচরণের ‘নববাবুবিলাস’ ও ‘নববিবিবিলাস’ যেন উনিশ শতকের বাবু কালচার ও বেশ্যা সংস্কৃতির এক অনুপুংখু ম্যনুয়েল। কলকাতার ধনী যুবকের লাম্পট্য, পরস্ত্রী সম্ভোগ ও বহু নারীগমনের কেচ্ছা সম্বলিত পুস্তক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দূতীবিলাস’। কলকাতার সম্পন্ন পরিবারগুলোতে পুরুষতান্ত্রিক যৌন অবরোধের ভিতর গৃহস্থ মেয়েদের নিজস্ব শারীরিক উপভোগ বা সমকামীতার এর ছবি পাওয়া যায় ‘দূতীবিলাসে’। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-তে আছে সমাজ যৌনতার কথা। কিন্তু এই সময়ের লেখকেরা নৈতিক দিক দিয়ে সকলেই ছিলেন প্রায় বিবেকের ভূমিকায়।
বলা যায়, কথা সাহিত্যের যথার্থ আত্মপ্রকাশ বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে। তিনি যৌন মানসিকতার শৃঙ্খলায় কঠোরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। বাংলা দেশে ‘প্রেম’ নামক পদ্ধতিটির আবিষ্কারক বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের কালে এবং বঙ্কিমের কলমে নারীর শরীরে ফুটেছিল কমল হীরের দ্যুতি। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যে নারী ও এবং প্রেমের ভূমিকা নিয়ে খুব তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন পূর্ণেন্দু পত্রী,
“বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সারা জীবনে যা কিছু লিখেছেন তার অর্ধেক বিষয় ভালোবাসা, বাকি অর্ধেক ধর্ম, সমাজ ও ইতিহাস। বঙ্কিমচন্দ্র ভালোবাসা নিয়ে যা কিছু লিখেছেন, তার অর্ধেকটা জুড়ে নারী। বাকি অর্ধেকটা সমাজ-সংস্কার এবং সংঘাত। বঙ্কিমচন্দ্র নারীদের নিয়ে যা কিছু লিখেছেন তার অর্ধেকটা জুড়ে তাদের রূপ, তাদের সৌন্দর্যের মোহ, তাদের দৈহিক আকর্ষণ বাকি অর্ধেকটা হৃদয়ের ভিতরকার নদ-নদী, জল, জলস্তম্ভ এবং জোয়ার ভাঁটা।” অর্থাৎ এক কথায় দাঁড়াল রূপবতী রমনীরাই বঙ্কিমচন্দ্রের যা কিছু সৃষ্টির অর্ধেক।
কথাসাহিত্যের চারা গাছকে বাঁচানোর দায়িত্ব ছিল বঙ্কিমের একক কাঁধে। ফলে তাঁকে এগোতে হয়েছে খুব সাবধানে। সমাজ-স্বাস্থ্যের নজরদার বঙ্কিমের পক্ষে অসম্ভব ছিল হৃদয়চর্চার কাহিনি রচনা করা। বিষবৃক্ষের ‘কুন্দনন্দিনী’ বা কৃষ্ণকান্তের উইলে ‘রোহিণী’ চরিত্র চিত্রায়নে তিনি যৌনতাকে ব্যবহার করেছেন কাহিনির প্রয়োজনে। প্রয়োজন ফুরোতেই তিনি তাদের মেরে ফেলেছেন। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বঙ্কিমের সমসময়ের। তিনি তাঁর ‘রূপসী হিরণ্ময়ী’ আখ্যানে হিরণ্ময়ীর পরপুরুষ সম্ভোগের কথা রাখঢাক না করেই বলেছেন পরে অবশ্য তিনি হিরণ্ময়ীর এই প্রবণতার জন্য তাকে মারাত্মক শাস্তি দিয়েছেন।
তারপর এলেন রবীন্দ্রনাথ। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে যৌনতাকে তিনি দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’, ‘চোখের বালি’ ও ‘ঘরে বাইরে’ তৎকালীন সমালোচকদের কাছে নিন্দিত হয়েছিল। নিন্দুকদের মতে যৌনতাকে আশ্রয় করেই এই গল্পগুলির বিস্তার। তিনি বাংলা সাহিত্যে সৌন্দর্যতত্ত্বের পুরোহিত (High priest of beauty) এই সৌন্দর্যও তাঁদের কাছে যৌনভাবের সৌন্দর্য ছাড়া কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস তকমা পেল উদ্দাম কামপ্রবৃত্তির পোশাকি রূপের; যেখানে রোমান্সের সঙ্গে যৌনতাকে মেশানো হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ পূর্ণতার প্রতীক যৌবনের জয়গানে মুখর। বারবার কামনা করেছেন তার স্পর্শ, যৌবনকে দেখেছেন সুন্দর ও সত্য হিসেবে। আসলে দৃষ্টির আড়ালে যে গভীর গোপন মনের রসায়ন সেই মগ্নচৈতন্যের লুকোনো কারখানার সন্ধানে নেমেছেন সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসের নারী চরিত্রদের অবলম্বন করে। ‘চোখের বালি’-র মহেন্দ্র-বিনোদিনী অথবা ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা-সন্দীপের নানাবিধ যৌনতার সূক্ষ্ম বর্ণনা অত্যন্ত পরিশীলিত ভাবে আছে। রক্তমাংসের কামনা মূর্ত হয়ে উঠেছিল সন্দীপের মধ্যেও। বিমলাও চঞ্চল হয়েছে বার বার। নীতিবোধে আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ মহেন্দ্র-বিনোদিনী বা বিনোদিনী-বিহারীকে চুম্বন পর্যন্ত এগোতে দেননি।
“বিনোদিনী বিহারীর গলদেশ বাহুতে বেষ্টন করিয়া বলিল, জীবনসর্বস্ব, জানি তুমি আমার চিরকালের নও, কিন্তু আজ এক মুহূর্তের জন্য আমাকে ভালবাসো! তারপর আমি আমাদের সেই বনে-জঙ্গলে চলিয়া যাইব, কাহারও কাছে কিছু চাহিব না। মরণ পর্যন্ত রাখিবার আমায় কিছু একটা দাও— বলিয়া বিনোদিনী তাহার ওষ্ঠাধর বিহারীর কাছে অগ্রসর করিয়া দিল।”
ব্যস্, ওই পর্যন্ত। শিল্পে সাহিত্যে যৌনতার নিবিড় প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের না-পসন্দ ছিল। তাই দেখা যায়, তাঁর উপন্যাসে বা গল্পে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের চিত্রিত চরিত্রেরা সংযম হারিয়েছে। সাহিত্যে ও তাঁর রচনায় যৌনতা আছে, কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গি পরিশীলিত, অন্যরকম। রবীন্দ্রনাথের রচনায় কামনা থাকলেও কামের জায়গা ছিল না। তিনি কোথাও বাস্তবতার নামে উচ্ছৃঙ্খলতার প্রশ্রয় দেননি।
বলা বাহুল্য, সে যুগের নীতিবোধ, সামাজিক প্রেক্ষিত এ জাতীয় ঘটনা দেখাবার প্রতিকূল ছিল। তাতে পাঠক আনুকূল্য পাওয়া সম্ভব হত না। পাঠকপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ এরকম ঝুঁকি নিতে পারেননি। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো না মেরে বিধবা বিনোদিনীকে তিনি কাশী পাঠিয়ে দিয়েছেন আর সন্দীপ পালিয়েছে উত্তরের ট্রেনে চেপে। এইসব ঝামেলার চরিত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
এবার শরৎচন্দ্র। বিরোধীদের কথায়, ‘রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় ও চোখের বালির একটা মিলিত সংস্করণ বাহির হইয়াছে তাহার নাম শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’। কিছু নীতিবাদী প্রাবন্ধিকের ধারণা হয়েছিল যৌনতা আমদানি করে অশ্লীল ও দুর্নীতিগ্রস্থ সাহিত্য লিখে শরৎচন্দ্র দেশের মানুষকে নরকস্থ হবার পথ দেখাচ্ছেন। এখানে উল্লেখ্য শরৎচন্দ্রের লেখা ‘প্রবাসী’র কাছে প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ চরিত্রহীনের কিরণময়ী ও সাবিত্রীর দিকে। বুদ্ধদেব বসু তো লিখেই ফেললেন “সাবিত্রীর মতো মেসের ঝি থাকলে আমরা মেসেই পড়ে থাকতুম।”
শরৎসাহিত্যেও যৌনতা আছে তবে তা শিল্পসম্মত উঁচু মানের পর্দায় বাঁধা। উঁচুদরের রসিক না হলে তার প্রকাশভঙ্গি ধরা মুশকিল। শ্রীকান্ত চতুর্থ পর্বে রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তকে এক জায়গায় বলছে - ‘তোমাকে কী বিনামূল্যে অমনি অমনিই নেব তার ঋণ পরিশোধ করব না? আর আমিও যে তোমার জীবনে সত্যি করে এসেছিলুম যাওয়ার আগে সেই আসার চিহ্ন রেখে যাব না? এমনি নিষ্ফলা চলে যাব? কিছুতেই তা আমি হতে দেব না।’ এই কথার পিছনে যে ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে তা যৌনতারই নামান্তর। তবে শরৎচন্দ্রের নায়ক-নায়িকারা সব সময়ই যৌনমিলন হতে নিজেদের দূরে রেখেছে।
শরৎচন্দ্রের কোমল শান্ত-মৃদু যৌনতাকে অতিক্রম করে ধুর্জটিপ্রসাদ তাঁর ‘অন্তঃশীলা’ উপন্যাসে লিখলেন রমলাদেবীর কথা। শরৎচন্দ্রের সুরেশ অচলা লোকলজ্জার জন্য যা করতে পারেনি তাই করে দেখিয়ে দিল রমলা-খগেন। জগদীশ গুপ্তর যৌনতার জগৎ আরও তীব্র আরও তিক্ত। জগদীশ গুপ্ত লিখলের ‘লঘুগুরু’, ‘রতি ও বিরতি’, ‘শ্রীমতী রোমন্থন’, ‘তাতল সৈকত’। লঘুগুরুর জগৎ সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেন রবীন্দ্রনাথ। যৌনতার এক বিচিত্র উদাহরণ জগদীশ গুপ্তের ‘অরুপের রাস’ গল্পটি। ছোটবেলার খেলার সঙ্গী পাড়ার কানুদাকে ভালোবেসেছিল রাণু। কিন্তু কানুদার শরীরকে সে পায়নি। তাই কানুদার শরীরের স্পর্শ লেগে থাকা কানুদার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করে রাণু কানুদার শরীরের স্বাদ নিয়েছে।
বিভূতি সাহিত্যেও নর-নারীর প্রেম আছে কিন্তু সৃষ্ট প্রেমের কাহিনীতে যৌবনের দাহ, মিলনের জন্য নর-নারীর তীব্র ব্যাকুলতার প্রকাশ নেই। বিভূতিভূষণ যে প্রেমের তীব্রতা বা যৌন আকর্ষণ সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ ছিলেন তা নয়। তাঁর ‘অথৈ জল’ নামে উপন্যাসে শহুরে প্রেম দেখাতে গিয়ে তিনি অনেকখানি আদিরসের সাহায্য নিয়েছিলেন। তবুও বলা যায় তার সৃষ্ট প্রেমিকা নারী কামনাময়ী নয়, নায়কচিত্তে সে দেহতৃষ্ণা জাগায় না, সে মমতাময়ী কল্যাণী প্রতিমা।
নালিশ শোনা যায় যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় জীবন থেকে যৌনতা বেশি। যে দুটি বই নিয়ে এই নালিশ তা হল ‘চতুষ্কোন’ উপন্যাস এবং ‘সরীসৃপ’ গল্পগ্রন্থ। তবে এই দুটিই শুধু নয়, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ সহ মানিকের প্রথম দিকের সমস্ত রচনাই যৌনতা মিশ্রিত মনস্তাত্ত্বিক রচনা। মানিক মনে করেন প্রেম হোক, কাম হোক, যৌনতা হোক, এ রহস্য জীবনেরই রহস্য, এ বিস্ময় জীবনেরই বিস্ময়। যৌনতা জীবনের একটি সুস্থ, প্রধান, অত্যাজ্য অংশ। তাঁর গল্প উপন্যাসে যৌনতা এসেছে জীবন রূপায়ণের অনিবার্য তাগিদে। মানিক কখনই যৌনতা সর্বস্ব নন। বরং বিবেকহীন যৌনতাকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। মানুষের অবচেতন মনের আলো-আঁধারের লীলার অপূর্ব শিল্পগুণান্বিত অথচ শক্তিশালী বিশ্লেষন আমরা মানিক সাহিত্যেই পাই।
কবিতায় যৌনগন্ধী শব্দ থাকার জন্য শিক্ষকতার চাকরি হারাতে হয়েছিল জীবনানন্দ দাশকে। তখনো তাঁর একটিও গল্প উপন্যাস প্রকাশিত হয়নি। যে সময়ে জীবনানন্দ দাশ গল্প উপন্যাসগুলো লিখেছিলেন তখন তাঁর বয়স ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। সে সময়টা যৌনবোধ ও যৌনযন্ত্রণার তীব্র দাপাপদাপির বয়স। স্বভাবিকভাবে যৌনতা তাঁর গল্পে উপন্যাসে উঠে এসেছে, তবে তা যৌন উত্তেজনার আগুন পোহানোর জন্য নয়। মূলত দাম্পত্য জীবনের স্থিরতা অস্থিরতাকে কেন্দ্র করেই তাঁর গল্প উপন্যাসে উঠে এসেছে নারী ও যৌনপ্রসঙ্গের দ্বন্দ্ব সংঘাত। প্রেম জীবনানন্দর কাছে শরীরী-মিলনের সার্থকতা নয়, বরং তা অপ্রাপ্তির ধূসরতা।
‘’সাহিত্যে লালসা ইতি পূর্বে স্থান পায়নি বা এর পরে স্থান পাবে না এমন কথা সত্যের খাতিরে বলতে পারিনে’’ রবীন্দ্রনাথ যখন একথা বলছেন ততদিনে বাংলা সাহিত্যে উচ্ছৃঙ্খলতা আর অসংযমের বাঁধভাঙা বন্যা দেখা দিয়েছে। তারুণ্যের জয়পতাকা ওড়াবার নামে ‘কল্লোলে’র লেখকরা শালীনতা, শোভনতা ও সুমার্জিত রুচিবোধকে ধুলোয় কাদায় টেনে নামিয়ে দিয়েছেন। অশ্লীলভাবে দেহবাস্তবের নগ্নতাকে উদ্ঘাটন করে বাংলা সাহিত্যের কোমল লাজুক বাতাবরণকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
কাম The Desire
বর্ণালী রায়
প্রকাশক: শালিধান
মুদ্রিত মূল্য: 449/-
পাওয়া যাচ্ছে...
কলেজ স্ট্রিট:
👉 দে বুক স্টোর (দীপু)
👉 ভারতী বুক স্টল
👉 আদি দে বুক স্টোর
👉 দে’জ পাবলিশিং
👉 অরণ্যমন
👉 শব্দ
👉 নিজস্ব অনলাইন স্টোর: https://shalidhan.com/product/kama-the-desire/
👉 আমাজন: https://www.amazon.in/dp/8196020732?ref=myi_title_dp
(হোয়াটস্অ্যাপ): 7001877312