15/10/2020
আচ্ছা, এ্যাডভার্টাইজমেন্টের কাজ কি ?
জানি সোজা উত্তর দিবেন - "বিক্রি বাড়ানো ।"
আমি বলব - "নাহ, তা না ।"
ভাবছেন পাগল হয়ে গেছি !
মনে প্রশ্ন আসছে বিক্রিই যদি না বাড়ে তবে কোম্পানীগুলো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে এ্যাড দিচ্ছে কেন ? ওরাও কি পাগল হয়ে গিয়েছে ?
নাহ, কেউই পাগল হয়নি । তবে এটাও ঠিক যে Advertising এর কাজ বিক্রি বাড়ানো না ।
তবে ?
দাঁড়ান, সেটিই বলছি ।
তার আগে একটা প্রশ্ন করি - "শেষ কবে আপনি নিজে কোনো এ্যাড দেখে সেই প্রোডাক্ট কিনতে দোকানে দৌড় দিয়েছেন ?"
চিন্তা করে দেখুন তো ।
বাজী ধরে বলতে পারি এমনটি আপনি জীবনেও করেন নি । ছোট বেলায় টিভিতে চকলেটের অ্যাড দেখে দু-একবার করলেও অন্ত:ত বড় হবার পর তো নয়ই ।
আপনার মতো, পৃথিবীর কোনো ম্যাচিউরড মানুষই এ্যাড দেখে দোকানে দৌড়ে গিয়ে হামলে পরে না, যদি এ্যাডখানা জীবন রক্ষাকারী কোনো ঔষধ বা টিকার মত কিছু না হয় ।
তবে এ্যাডের কাজটা কি ?
এ্যাডের আসল কাজ হচ্ছে প্রথমত মাত্র দুটো -
১) ব্র্যান্ডের জন্য Awareness তৈরী করা
২) ব্র্যান্ডটিকে Consideration set এর ভেতর আনা।
আজকের পৃথিবীতে Toothpaste-Soap-Shampoo-Car-Electronics-Travel operator-Fashion যে ক্যাটাগরীই হোক অসংখ্য ব্র্যান্ড আছে । Technology খুব সহজ হওয়ায় প্রোডাক্টের ভেতর বিরাট পার্থক্য আনাটাও এখন কঠিন । আর আনতে পারলেও পরদিন দেখবেন কেউ না কেউ কপি করে ফেলেছে । তাই এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ভেতর যে কোনো ব্র্যান্ডের জন্য অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে মানুষের মাথায় নিজের জন্য ছোট্ট একটু স্থান করে নেয়া । সে যখন ঐ ক্যাটাগরীর প্রোডাক্ট বা সার্ভিস কিনতে চাইবে, সাথে সাথে যেন আরও দু-একটি ব্র্যান্ডের সাথে ঐ ব্র্যান্ডের নামটিও মাথায় আসে । এটিকেই আমরা মার্কেটিংএর ভাষায় বলি 'Consideration set' । আর যে কোনো ব্র্যান্ডের জন্য এই সেটের ভেতর স্থান পাওয়াটা ভীষণ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ । গবেষনা বলে ৯৫% Purchase ঘটে Consideration set এর ভেতর থাকা ব্র্যান্ডগুলোর ভেতরেই । সেটের বাইরে থাকা ব্র্যান্ডগুলো খুব বেশী হলে বাকী ৫% সেলস দখল করতে পারে, তাও বিশাল কোনো disruption ঘটিয়ে, যেমন - ডিসকাউন্ট, ফ্রী অফার, Consumer Promotion, Point-of-Purchase এর জায়গায় ব্র্যান্ড প্রমোটার দিয়ে ইত্যাদি, যার প্রতিটিই অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার; আর এক্সিকিউশনের ঝামেলার কথা নাই বললাম ।
এ্যাডভার্টাইজমেন্টের মূল কাজটিই এটিই । বিশেষ করে ব্র্যান্ডটি যদি কোনো প্রতিষ্ঠিত, জানাশোনা ব্র্যান্ড হয় তাহলে এ্যাডভার্টাইজমেন্টের কাজ আসলে এই একটিই - যে করেই হোক Brand টিকে Consideration set এ র ভেতর জায়গা করে নেয়া ।
প্রশ্ন হলো এই কাজটি Advertisement ঠিক কিভাবে করে ?
উত্তর হলো এই কাজের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে 'কানাকানি'কিংবা 'ফিসফিসানি' তৈরী করা । কানাকানি, ফিসফিসানি……সেগুলো আবার কি ? সেগুলো হচ্ছে Marketing-এর ভাষায় যাকে আমরা বলি 'Word of mouth' । ব্র্যান্ড যদি আলোচনায় থাকতে পারে, যাকে আধুনিক ডিজিটাল দুনিয়ায় বলে 'ভাইরাল', তবে সে মাথার ভেতরে জায়গা করে নিবে । তবে ফায়দা উঠাতে সেটি অবশ্যই 'পজিটিভ ভাইরাল' বা 'Word of Mouth' হতে হবে । ভাইরাল হবার নেশায় জলিল হয়ে লাভ নেই । তাতে বরং উল্টো ক্ষতি !
যা হোক, যা বলছিলাম । যদি আপনার ব্র্যান্ডখানা পজিটিভলি আলোচনায় থাকতে পারে, তবেই সে কেনার সময় অপশন হিসেবে সামনে আসবে; অর্থাৎ, Consideration set এর ভেতর থাকবে । আর তখনই তার পক্ষে Purchase ঘটাবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী হবে।
ঠিক একারণেই ব্র্যান্ডগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে Advertisement এর পেছনে । চমৎকার সব ক্রিয়েটিভ তৈরী করে, চমক জাগানো সব গল্প বলে, সোরগোল করে নানান Activations করে । উদ্দেশ্য একটাই - মানুষ যেন ব্র্যান্ডটিকে নিয়ে কানাকানি করে, কিংবা নিদেনপক্ষে ফিসফিস করে । সেটি যদি করা শুরু হয়, তবেই Advertisement কিংবা Activation, ATL কিংবা BTL যাই বলুন না কেন - সেটি সার্থক !
এখন ভাবুন তো এমন যদি হয় পয়সা খরচ করা ছাড়াই কোনো ব্র্যান্ড যদি আপনা থেকেই এই ফিসফিসানি বা কানাকানি বা Word of mouth তৈরী করতে পারে, তার জন্য ব্যাপারখানা কি অসাধারণ লাভজনক ! এ্যাড দিলাম ১০০ টাকার, অথবা প্রায় দিলামই না । কিন্তু লোকে নিজ থেকেই আমার ব্র্যান্ড নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিল । ডিজিটাল মার্কেটিং এ এই ঘটনাখানার আবার আলাদা একখানা গালভরা নাম আছে – Earned media. ব্র্যান্ড যদি এটি করতে পারে তো যাকে বলে কেল্লা ফতে !
ভাবছেন "যাহ ! তাই হয় না কি !"
আমি বলব "হয়, হয় । খুব ভাল করেই হয় । একদম চোখের সামনে টাটকা উদাহরণও আছে ।"
কোনটি ?
iPhone !
গতরাতে iPhone 12 ঘোষনা হয়েছে । একটু চিন্তা করে দেখুন তো আজ ভোর থেকে এখন পর্যন্ত এই আইফোন নিয়ে কতগুলো স্ট্যাটাস, আলোচনা, রিপোর্ট দেখেছেন ! আপনি নিজেও হয়ত উত্তেজিত হয়ে দু-লাইন লিখে ফেলেছেন "চার্জার নাই কেন ?", "কিডনী কোনটা বেচব ?", "নতুন কিছু দিলো না" । বানাচ্ছেন meme, দিচ্ছেন review ।
শুধু আপনি বা আমিই নই; পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ এটা নিয়ে কথা বলছে । আবার কেন এই মডেলের চাইতে আগেরটি কেনা বেশী ভাল (Value for money) সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে । এতে সব মিলিয়ে ভেবে দেখুন তো আদতে লাভ হচ্ছে কাদের ? অবশ্যই অ্যাপলের । যে কানাকানি-ফিসফিসানিটা তৈরী করতে ওদের কোটি কোটি ডলার খরচ করার দরকার ছিল, সেটি হয়ে যাচ্ছে আপনা থেকেই । একদম মিনি-মাগনায় !!!
এতে ওদের লাভটা হচ্ছে যে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মাথার ভেতর নতুন iPhone 12 বা অন্ত:তপক্ষে iPhone জোরালো Consciousness এ গেঁথে যাচ্ছে । এই কোটি কোটি লোক আগামী কয়েক মাসের ভেতর যখনই ফোন কিনতে যাবে, একবারের জন্য হলেও 'আইফোন' এর কথা মাথায় আনবে । হয়ত দাম বেশী বলে অনেকেও iPhone 12 কিনতে পারবে না । কিন্তু সেক্ষেত্রে শক্তিশালী সম্ভাবনা হচ্ছে তুলনামূলকভাবে কম দামী যে আগের মডেলগুলো আছে, সেটি থেকে কোনো একটি কিনে বসবে । তাতেও কিন্তু দিনশেষে লাভ সেই অ্যাপেলেরই । মডেল যেটাই বিক্রি হোক, টাকা তো তাদের ঘরেই যাচ্ছে !
ঠিক এখানেই Apple ব্র্যান্ডের স্বার্থকতা । iPhone এর মার্কেটিং টিমের জাদু ! টাকা না খরচ না করেও বিশ্বজুড়ে Word of mouth তৈরী করতে পারা । যে কথাবার্তা তৈরী করতে অন্য যেকোন ব্র্যান্ডের কোটি কোটি টাকা ঢালতে হয়, সেটি একদম মুফতে পেয়ে যাওয়া । খালি খালি কি আর Apple ট্রিলিয়ন ডলার কোম্পানী !
বলছিলাম এ্যাডভার্টাইজমেন্টের আসল কাজ নিয়ে । উদাহরণ হিসেবে বললাম কিভাবে Apple এ্যাডের আসল কাজটা almost ফ্রী-তে করিয়ে নিচ্ছে, আপনাকে-আমাকে দিয়েই ।
তাই নিজের ব্র্যান্ডের জন্য কম্যুনিকেশন প্ল্যান করার সময় আর কিছু না হোক এই একটি মাত্র জিনিষ মাথায় রাখা দরকার - কত বেশী কথা-বার্তা তৈরী করা যায় । সেটি যদি করতে পারা যায়, তবে সেলস আসবেই । অন্ত:ত ট্রায়াল তো হবেই । তবে ট্রায়ালের পরও সেলসের চাকা ঘুরবে কি না, সেটি নির্ভর করবে Advertisement বা Word of mouth নয়, বরং অন্য কিছুর উপর ।
আজ থাক । সেটি নিয়ে না হয় আরেকদিন গল্প করা যাবে ।
C. Galib Bin Mohammad