18/11/2020
#বইয়ের_আলো_পাঠশালা_ও_পেপাররাইম_ডট_কম_অণু_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
গল্পের নাম:অপেক্ষা
লেখিকা: রহিমা জান্নাত
আজ শনিবার। পথের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছে রাজু। রাজু একটা এতিমখানায় আরবি পড়াশুনা করে। বয়স দশ বছর। প্রতি সপ্তাহে শনিবার ওর আম্মু বা আব্বু ওর সাথে দেখা করতে আসে। আজও আসার কথা, কিন্তু দেরি হচ্ছে দেখে রাজু গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, কিছুক্ষণ পর অনুভব করতে পারে ওর মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখলো মা শিয়রে বসে আছেন। উঠে বসল। মা ওর জন্য কিছু রান্না করা খাবার আর বিস্কিট নিয়ে গেছেন। রাজু মায়ের সামনে বসে খেলো,রাজু মা আসলেই বায়না করে,কিচু কিনে দেওয়ার জন্য, মা যতটুকু পারে ছেলের আবদার মিটাতো।
রাজুর পরিবার খুবই গরিব। বাবা একজন কৃষক। মা সেলাইয়ের কাজ করে। এলাকায় গরিবদের কোন সম্মান আর দাপট নেই। তাই রাজুকে ওর সম বয়সী ছেলেরা মারধর করতো,,খেলায় নিতোনা। মা বিচার চাইতে গেলে বিচার পেতোনা। তাছাড়া ওর বাবা বহু কষ্টে একটা ধানের জমি করছিলো, সেই জমির ফসল এলাকার লোকেদের গরু, ছাগল খেয়ে নষ্ট করতো,,বড় বড় ছেলেরা জমির পাশে ক্রিকেট খেলতো,,ফলে জমিতে বল পড়লে নেমে জমির ফসল নষ্ট করে দিতো,,বারণ করলেও শুনতোনা। এবাবেই অবহেলিত রাজুর পরিবার।
তাই রাজুর মা রাজুকে দূরের এই এতিমখানায় রেখে গেছেন,,বাবা মা থাকা সত্বেও রাজু এতিম উপাধি পেল৷
মাটির চুলায় রান্না করতে হতো,,দশ বছরের ছেলে রান্না করতে জানতনা,,যেভাবে পারতো রান্না করতো, সাদা পাঞ্জাবিতে কালো দাগ পড়ে যেতো, আগুন জ্বালাতে পারতোনা,,ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করতো, তারপরে ও রান্না করতো,,ঝাড়ু দিতে হতো।রাতে ফ্লোরে ঘুমাতো,, অসুখ হলেও কেউ সেবা করার মত ছিলনা।
সপ্তাহের ছয়টা দিন অপেক্ষা করে কাটিয়ে দেয় মা আসবে এই ভেবে। পরীক্ষা হলো রাজুদের। ওর রোল এক। খুব খুশি রাজু। মা আসলেই বলবে।
শনিবার চলে আসলো, পথের দিকে তাকিয়ে আছে রাজু,,, আজ ওর মা তাড়াতাড়ি আসলো,,দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। মা আমি পাশ করেছি, রোল এক। । মা ও খুশি হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। মা দেখে বিজয়ের হাসি হাসত, আর ভাবতো কত বড় হয়ে গেছে আমার ছেলে, কত কাজ করে। তারপর চলে আসলেন।
রাজুর মায়ের অসুখ অনেকদিন যাবত,,ঠান্ডার মধ্যে ও সিলাই করতো৷ কাশি খারাপ হয়ে গেছিলো।কাশির সাথে রক্ত যেতো। কখনও বমিও হতো। টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছে যেতোনা।
চিকিৎসা না করার ফলে ছোট রোগ অনেক বড় আকার নেয়,আর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রাজুর মা। অবশেষে ধরার বুক থেকে বিদায় নিলেন তিনি।
রাজুর মন ভেঙে যাবে বলে কেউ ওর মায়ের মৃত্যুর খবর জানায়নি।
মাঝে একটা শনিবার চলে গেলো। রাজু অপেক্ষা করতে লাগলো কখন ওর মা আসবে,। কিন্তু মা তো আসেনা। মন খারাপ হয়ে যায় রাজুর। কেমন অজানা ব্যথায় মন ভারী হয়ে উঠে। অজান্তেই চোখের কোণে জল চলে আসে।
মাঝে একটা শনিবার চলে গেলো,তাও ওর মা আসেনা। ব্যকুল হয়ে উঠে রাজু। কিছু হলোনা তো মায়ের মনে মনে ভাবে রাজু। মনে হয় রাগ করে আসেনা। আমি আবদার করি বলে। আর কোন আবদার করবোনা মায়ের কাছে। পথ চেয়ে বসে থাকে রাজু। কখন ওর মা আসবে --- ও তো জানেনা ওর মা আর কোনদিন ও আসবে না।