08/03/2025
সিভিল সমাজে সৈনিকের সাদা-মাটা চলা-ফেরা, আচার-আচরণ দেখে অনেকেই নাক সিটকান। অনেকেই মনে করেন সৈনিকরা আমাদের চাইতে অনেক বোকা। কিন্তু সৈনিকরা কি আসলেই আপনার ভাবনার মত? কখনওই নয়। বরং সৈনিকরা আপনাদের চাইতে অনেক ট্যালেন্ট। হাজার হাজার ট্যালেন্ট তরুনদের মধ্য হতে সেরা তরুণদেরকে বাছাই করে বাহিনীতে ভর্তি করানো হয়। তাদের বাহিরের অংশকে দেখে ভিতরটা অনুমান করা কঠিন। কারণ- প্রত্যেকটা সৈনিক এক একটা মহাকাব্যের নায়ক। আমাদের গল্প গুলি পাঁচ তালার আলিসান ফ্ল্যাট হতে শুরু হয় না।
আমাদের গল্পগুলি শুরু হয় শীতের মাঝ রাতে কনকনে ঠান্ডা আর কুয়াশার আবরণে দাঁড়িয়ে ডিউটি রত অবস্থায়। আমদের গল্পগুলি কেউ লিখেনা, কারন আমাদের গল্পে মুগ্ধ হবার কিছু নেই। আশ্চর্য হবেন না। নিম্ন বিত্ত পরিবার হতে উঠে আসা এই মানুষ গুলির মনটা কত বড়। নিজের জীবনটা শুধু দেশের নামেই লিখে দেয়না, লিখে দেয় পরিবারের নামেও। সময় দেয় দেশকে আর অর্থ দেয় পরিবারকে। এদের নিজের কিছুই নেই। পরিবারের চাহিদা পূরন করতে করতে নিজেদের চাহিদা ভুলে যায়। কত অজস্র মাইল হেঁটে চলেছে, কিন্তুু একশ কদম দূরে থাকা সুখ পর্যন্ত পৌছাতে পারেনা। জীবনটা একটা সংরক্ষিত গন্ডির কাটাতারে আঘাত খেতে খেতেই শেষ হয়ে যায়। যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ে যায়, তাদের স্বাধীনতার গন্ডিটা কত ছোট। ডিউটি পোস্ট হতে পাঁচ কদম দূরে খোলা স্থানে যেতে পারেনা। কষ্ট লুকানো হাসিমুখটা দেখেছেন, মনের ভিতরে কষ্ট জমানো মলিনমুখটা দেখেন নি,কাজের জন্য সে ছুটি পায় না।১৬ই ডিসেম্বরের জাতীয় কুচকাওয়জের ড্রিল দেখে মুগ্ধ হন।
কিন্তু জানেন না, দিন রাতে ১৮ ঘন্টা করে তাকে নিংড়ানো হয়েছে, ড্রিলের ছন্দ মেলানোর জন্য। বর্ডারে গুলাগুলির ঘটনার খবরে গরম হয়েছেন, নতুন কোন দৃশ্যের অবতারণায়, কিন্তু জানেন না সেই সময় ডিউটিতে থাকা সৈনিকটার কানের পাশ কেটে যাওয়া বুলেটের শোঁ শোঁ শব্দের আতঙ্কিত বাতাসের প্রবাহ।আন স্মার্ট, গোঁয়ো সৈনিকদের দেখে বিরক্ত হউন, কুচকে যাওয়া শার্ট, বেঢপ আকৃতির প্যান্টের ইন করা দেখে মুচকি মুচকি হাসেন, কিন্তু কখনো কি বুঝেছেন, আপনার শরীরে যে পোশাকটা জড়িয়ে আছে, তাতে তাদের কৃতিত্ত্বটাও জড়িয়ে আছে? নইলে কবেই সাদা কাফনে জড়িয়ে কবরে শুয়ে থাকতেন। বাহিরে হোটেলে তাদের বুুবুক্ষের মতো খেতে দেখলে লজ্জাহীন হাসি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেন, কিন্তু জানেন কি? সেই সৈনিকটা একমাস পর টাটকা খাবার খেল। দূর্গম পাহাড়ী এলাকায় মাসের পর মাস ডিউটি করে ফ্রিজিং করা খাবারটা একবার খেয়ে দেখেছেন কি??? দু-একটি টাকা কমানোর জন্য দোকানদারের সাথে দামাদামি করতে দেখলেই ভাবতে পারেন, কত ছোট লোকরে বাবা। আপনি কি জানেন?? তার শরীর ঘামা অল্প কিছু বৈধ বেতনের টাকাতে তাকে তার বাবা-মা, নিজের স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ পোষণ, সন্তানদের পড়াশুনা, বাসা ভাড়া, সবার খাবারের ব্যবস্থা করে কিভাবে চলতে হয়???
দশ টাকা রিক্সা ভাড়া বাঁচাতে সে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে চলে। মাঝরাতে যখন আপনি কম্বলের নিচে আরেকটু গুটি মেরে শুয়ে থাকেন, তখন সে ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে উঠে পায়ে বুট পড়েন, আপনার শান্তির নিদ্রাকে তরান্বিত করতে। কারন তার ডিউটির সময় হয়ে গেছে। গরমের দিনে আপনি এসি ছেড়ে, কয়েল জ্বালিয়ে মশারি টানিয়েও বলেন, কত মশা? সে তখন ঝোঁপের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অযস্র মশার কামড় সহ্য করে দুই তিন ঘন্টা কাটিয়ে দিচ্ছেন। সে সবাইকে নিরাপত্তা দেয়, কিন্তু তার নিজেরই নিরাপত্তা নেই। সময় অসময়ে কর্মসম্পাদনের দুর্ঘটনায় শত্রুপক্ষের একটি মাত্র বুলেট এসে কখন যে, তার জীবন প্রবাহ নিভিয়ে দিয়ে যায়, সে চিন্তা তার অন্তরে থাকে না। সন্ধ্যা রাত হতে শুরু করে ভোর পর্যন্ত ব্যাংকার আর ট্রেন্স খুঁড়ার পরও ২০ কিলোমিটার পাঁয়ে হেটে মহড়া দিতে হয়।
তার শরীরের প্রতিটা পরতে পরতে ক্লান্তি। রোমান্টিকতা আসবে কোথা হতে? এটাই হলো সৈনিক জীবন। বেলা শেষে যখন আপনি প্রেয়সীর সাথে আড্ডা দিয়ে ফিরেন, সৈনিকরা তখন সারা শরীরে লেগে থাকা ঘামকে শাওয়ারের নিচে দাড়িয়ে পরিস্কারে ব্যস্ত থাকেন। কথার ছলে একটা কথা সৈনিকরা প্রায়ই বলে থাকে, তাদের পা নাকি প্রতিদিন আল্লার কাছে প্রার্থনা করে বলে "হে আল্লাহ! আর যদি পূর্নজন্ম হয়, তবে সৈনিকের হাটুর নিচে আমারে যোগ করে দিওনা"। হাজার হাজার ফোসকা পড়ে গলে গিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া পা গুলি দেখতে আপনার মনে প্রেম আসবে না। তার জীবনের গল্প আছে। কিন্তু বাস্তবতার কষাঘাতে সেগুলি ধূসর অন্ধকার। কতটা সংকীর্ণতা নিয়ে তাকে বাঁচতে হয়, সে আপনাদের কল্পনারও বাহিরে।