04/05/2026
বর্তমান AI এর যুগে প্রায় সকলের হাতেই আছে ডিজিটাল ডিভাইস। সকলেই জীবনকে আরো সহজ করার জন্য যা যা করা দরকার সেটাই করতেছে। প্রযুক্তির সাহায্যে জীবনকে সহজ করার সব ধরনের চেষ্টা মানুষ নামের প্রাণীগুলো করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্ত প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত ঝুকে পড়া জাতি কি আদৌ প্রযুক্তির দ্বারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারছে?? বেশিরভাগ মানুষই আজ মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্থ। আমাদের অভ্যাস ও কাজকর্ম আমদেরকে নিয়ে যায় হতাশার দিকে। কিন্ত সবকিছুর পরেও এমন কিছু কাজ আছে যেগুলোর মাধ্যমে বেশ শান্তি, সুখ ও মানসিকভাবে ফুরফুরে থাকা যায়। তার মধ্যে অন্যতম হলো নন একাডেমিক বই পড়া। গল্প,উপন্যাস,কবিতা,ফিকশন,নন-ফিকশন বই পড়ার অভ্যাস আমাদেরকে অনেকভাবে উপকৃত করে। তবে বর্তমানে প্রযুক্তির বরাতে এই ভালো অভ্যাসটি এখন আগের তুলনায় কমে গেছে। মানুষ আগের মতো আর বই পড়ে না। এজন্য আজকে কথা বলবো নন একাডেমিক বই পড়ার উপকারিতা নিয়ে।
বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে যে নন একাডেমিক বই পড়ার ফলে ব্যক্তির জ্ঞানগত, আবেগগত, সামাজিক, পেশাগত ও আজীবন শিক্ষার বিভিন্ন দিক উন্নত হয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গল্প ও উপন্যাস পড়লে মস্তিষ্কের সংযোগ বাড়ে ও পারস্পারিক সহানুভূতি (empathy) উন্নত হয়। নিয়মিত পড়ার অভ্যাস বার্ধক্যকালে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা সংরক্ষণ করে এবং স্নায়ুবিক পটভূমি জাগ্রত করে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের উপর এক গবেষণায় দেখা গেছে অবসরকালে বই পড়ার ফলে মানসিক চাপ ও উৎকন্ঠা কমে যায়। নন-একাডেমিক পড়ার ফলে আমরা যে যে উপকারিতা পেয়ে থাকি বিভিন্ন গবেষনালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে নিচে তা উল্লেখ করা হলো।
১)জ্ঞানগত উপকারিতাঃ
নন-একাডেমিক বই পড়া মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও শব্দভান্ডার উন্নত করে। ইমরি ববিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দেখিয়েছেন যে সুদৃঢ় গল্প পাঠের পর মস্তিষ্কের ভাষা ও কল্পনা ক্ষেত্রে সংযোগ বাড়ে যা পরবর্তীতে "Shadow activity" বা মস্তিষ্কের জৈবিক স্মৃতিতে রুপান্তরিত হয়। আরো একটি গবেষনায় দেখা গেছে বৃদ্ধদের নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের শক্তি ক্ষয় (কগনিটিভ ডিক্লাইন) প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। গল্প পাঠের কারণে (Theory of mind) উন্নতিরও প্রমাণ রয়েছে।
২)আবেগগত ও মানসিক সাস্থ্যের উপকারিতাঃ
নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মনোবিজ্ঞান ও মানসিক সাস্থ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি কানাডিয়ান সমিক্ষায় দেখা গেছে যে শিক্ষার্থীরা এক বছরে অবসরবেলা যে বই পড়ে সেটি উক্ত বছরে তাদের মানসিক চাপ এবং উৎকন্ঠা কমাতে সাহায্য করেছে।গবেষকরা রিপোর্ট করেছেন "Recreational reading reduces psychological distress in college students." অর্থাৎ বই পড়া, শিক্ষার্থীদের
মানসিক স্বস্তি এবং ক্ষুদ্র মানসিক সমস্যার উপর প্রভাব ফেলে। এছাড়া UK'র NIHR এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে বই পড়া দৈনন্দিন চাপ থেকে মুক্তি, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও স্মৃতি গড়ে তোলা এবং গল্পের অনুভূতি নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করার মাধ্যমে মানুষকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখে। অধ্যাপক ক্রিস্টোফার বার্গল্যান্ড বলেছেন "একজন পাঠক যখন কল্পনার মাধ্যমে অন্য কারো অনুভূতির সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করে, তখন কল্পনাগুলো মস্তিষ্কে এক ধরনের 'মাসেল'স মেমোরির' মতো কাজ করে।
৩)সামাজিক উপকারিতাঃ
কাহিনী ও উপন্যাস পড়া সহানুভূতি ও সামাজিক বোধ বাড়াতে সাহায্য করে। গবেষক Bal এবং Veltkamp দেখিয়েছেন, উপন্যাসে গভীর নিমজ্জনের মাধ্যমে পাঠকরা অন্যের অনুভূতির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে যার ফলে সহানুভূতির মাত্রা বাড়ে। এ সম্পর্কে লেখিকা ম্যালোরি ব্ল্যাকম্যান বলেছেন, "পড়া হলো সহানুভূতির অনুশীলন; তা কিছু সময়ের জন্য অপর কারোর জুতোয় পা রাখার অনুশীলন। বই পড়ার মাধ্যমে পাঠক বিভিন্ন সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারে ফলে সামাজিক বোঝাপড়া উন্নত হয়। বই পড়ার মাধ্যমে ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি বোঝাপড়া জন্মায়।
৪)পেশাগত ও সৃজনশীল সুফলঃ
বইপড়া সৃজনশীলতা ও নতুন দৃষ্টিকোণ এনে দেয়, যা পেশাগত সফলতাতেও কাজে লাগে। অ্যানগাস ফ্লেচার (ওয়াহো স্টেট) জানান যে, গল্প আমাদের মস্তিষকে জাগিয়ে নতুন উদ্ভাবন ও সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে। তিনি আরও বলেন গল্প বা উপন্যাস মস্তিষ্ককে যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা দেয়। পৃথিবীর অনেক সফল ব্যক্তি তাদের সফলতার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে নন-একাডেমিক পড়াশোনাকে উল্লেখ করেছেন। স্টিফেন কিং বলেছেন, "যদি আপনার কাছে পড়ার সময় না থাকে তাহলে আপনার কাছে লেখার জন্যও সময় (হাতিয়ার) থাকবে না। এজন্য পেশাগত সফলতা অর্জনে এবং নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সৃজনশীলতাকে বাস্তবে রুপ দিতে বই পড়ার বিকল্প নেই।
৫)আজীবন শিক্ষার সুবিধাঃ
বই পড়া আমাদের শেখার যাত্রা আজীবন ধরে রাখে।নিয়মিত অবসর-পাঠন করা মানে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি। UNESCO এর শিক্ষা বিষয়ক নীতি গুলো থেকে জানা যায় স্নাতক পরবর্তী বা কর্মজীবনের পরে অবসর-পাঠন জীবনভর শেখার একটি অংশ এবং সামাজিক উন্নয়নে সহায়ক।
উপরে বিভিন্ন তথ্যের সাহায্যে আমরা জানলাম নন-একাডেমিক বই পড়া কেন জরুরী। তাই উপরে উল্লেখিত উপকারগুলো নিজের জীবনে পাওয়ার জন্য হলেও আপনাকে বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। বের হয়ে আসতে হবে প্রযুক্তিগত আসক্তি থেকে। আসুন আমরা বই পড়ার অভ্যাস ধারণ করি এবং একটি উন্নত সভ্য সমাজ গড়তে নিজেদেরকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পৃথিবী বইয়ের হোক।
সোর্স সমুহঃ
1. Reading Fiction Improves Brain Connectivity and Function | Psychology Today
2. How does fiction reading influence empathy? An experimental investigation on the role of emotional transportation - the University of Bath's research portal
3. (PDF) Reading activity prevents long-term decline in cognitive function in older people: evidence from a 14-year longitudinal study.
4. Short- and Long-Term Effects of a Novel on Connectivity in the Brain - Gregory S. Berns, Kristina Blaine, Michael J. Prietula, Brandon E. Pye, 2013
5. (PDF) For the love of reading: Recreational reading reduces psychological distress in college students and autonomous motivation is the key.
6. A novel way to boost health: research shows how reading can be used to improve mental health and wellbeing - ARC
7. Cognitive effects of reading fiction: A meta-analysis - IGEL 2023 - Concordance.
8. Reading Literary Fiction and Theory of Mind.
9. Kindful Kids Weekly.
10. President Obama says novels taught him how to be a citizen | Fiction | The Guardian.
11. Sparking creativity through reading | The Ohio State University.
12. Literacy | UNESCO.