08/06/2026
ঈদের পরপর একটা দাওয়াত ছিল আমার বাসায়। রান্না করতে হয়েছিল অনেকজনের। মাছ ভাজার সময়ে তেল ছিটকে পড়লো গালে, ঠোঁটে, হাতে। ভয়াবহ অবস্থা। আমি বরফ দিলাম। স্বাভাবিকভাবেই রান্না শেষ করলাম। রাঁধতে গেলে হাতে তো প্রায়ই তেল ছিটকে পড়ে, তো এই জ্বালাপোড়ায় অভ্যস্ত আমি। কিন্তু গালের অংশে একদম চামড়া উঠে গেল।
তাও এটা তুচ্ছ ঘটনা। যারা রেগুলার রাঁধে তাদের সবার কাছেই তুচ্ছ।
এরকম হয়। একটু তো পোড়া।
বিকালে মায়ের বাসায় গেলাম। মা আমাকে দেখামাত্র আৎকে উঠলেন।
—গালে কি তোর? আয়হায়! মুখটা তো শেষ।পুড়লি কেমনে? তেল পড়ছে? কি মাছ ভাজছস? পাবদা?
আমি বলিওনি কি হয়েছে।
আম্মু বার্না ক্রিম বের করলেন। কিছু একটা কাজ করছিলেন। হাত ধুয়ে এসে ক্রিম লাগাই দিলেন। তার আফসোসের শেষ নাই।
—কেমনে পুড়লি মা? কেমনে? কি দরকার এত রান্নার!
এরপরে যতবার মায়ের কাছে গেছি আম্মু নিজের হাতে বার্না লাগাই দিছে। পৃথিবীতে তার সবথেকে সুন্দরী মেয়েটার মুখে দাগ পড়া নিয়ে তার আফসোসের শেষ নাই।
—মরার সংসারে মেয়েডা আমার রানতে রানতে শেষ।
আমার উনিশ বছরের সংসার। সেদিন আমি প্রায় বত্রিশ জনের জন্য রান্না করছি। আমার স্বামী আছে, সন্তান আছে। তারা আমাকে খুব ভালোবাসে। আমার একটা বহুলোকের শশুরবাড়িও আছে। অনেক আত্মীয় আমার। সবাই আমাকে ভালোবাসে। কারো চোখে পড়ে নাই কিছু। বেশি ভালোবাসে যারা, তুচ্ছ ঘটনা তাদের চোখে পড়ে না।
শুধু আম্মু আমার গালডায় হাত রেখে বলছে,
—আমার মেয়ের গালডা শেষ। বালের রান্নায় আমার মেয়ের গালডা পুড়ছে।
আমার ছেলে মেয়েরে ডেকে বলছে,
—আমার মাইয়াডা তোরার জন্য রানতে রানতে পুইড়া মরতেছে।
যতবার আম্মুর কাছে যাই, এই মহিলা বারবার আমারে বলে,
— একটু বার্না দিয়া দিই। আয় কাছে আয়।
তার দুদিন পর বেড়াতে যাব। ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে স্টেশনে আসছি। আম্মু সঙ্গে আসছে উঠাই দিতে। গালে হাত রেখে বলল,
—বার্না নিছোস সঙ্গে?
বললাম,
—লাগবে না। তুমি যে কি! দেখো কমে গেছে।
—কই কমছে মা? এই যে লাল। বার্না না দিলে তো শুকাবে না। একটা বার্না কিনে দিই দাঁড়া….
আমি ঢাকা থেকে মাকে যতবার ফোন করছি, আম্মু ভিডিওকলে গাল দেখতে চাইছে।
আফসোস করে বলছে।
—এত সুন্দর মুখটা। এত সুন্দর মুখটা আমার মাইয়ার..
আমার একটা উনিশ বছরের সংসার আছে। বত্রিশটা রোস্ট খাওয়ার মত একটা পরিবার আছে। তারা আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমার লাভ ম্যারেজ।
ভালোবাসায় টইটুম্বুর আমার জীবন।
কিন্তু আমার গালে ফোসকা পড়লে সেটা দেখার একজনই আছে। এই সারাদুনিয়ায় একজনই আছে যার আমার গালের সামান্য পোড়া সহ্য হয়না। যে আমার ট্রলিব্যাগে বার্না কিনে দেয়। যে একটু পরপর বলে,
—ইশশিরে গালডা আমার মেয়ের….
অথচ এই পোড়া কারো চোখেই পড়ে নাই। কেউ একবারের জন্যও জিজ্ঞেস করে নাই আমার ঔষধ লাগবে কিনা..
কী আশ্চর্যের বিষয় না?
Post Courtesy - Tridha Anika