01/03/2024
রূপায়ণের গল্প.....
দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির স্বর্ণযুগের শুরুটা কিন্তু বহু আগে। স্বাধীনতার অনেক বছর আগে থেকেই লোকজ মোটিফ, দেশীয় কাপড় নিয়ে কাজ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে আমাদের নিজস্ব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি। সেই আকাঙ্ক্ষা কখনও মিশেছে ব্যর্থতায়, কখনও আবার উঠে দাঁড়ানোর উদ্যম এনেছে নতুন আশার আলো। নানা চরাই উতরায় পার করে আজকে দেশের ফ্যাশন বাজারের ব্যাপ্তি হাজার কোটি টাকার বেশি। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের রুচি, পছন্দ-অপছন্দ এবং স্টাইলও। আদ্যোপান্ত থাকছে প্রতিবেদনে।
স্বাধীনতার পূর্বের চিত্র
সময়টা ১৯৫৫ সাল। পটুয়া কামরুল হাসান তার সহধর্মিণী মরিয়ম বেগমের সঙ্গে শুরু করেন পোশাকের দোকান ‘রূপায়ণ।’ ‘সে সময় সবাই বম্বে প্রিন্টের দিকে ঝুঁকছে। অথচ আমাদের দেশে যে কত সুন্দর সুন্দর মোটিফ আছে, তা সবারই অজানা। নকশার ক্ষেত্রে এই নিজস্বতাটাকে জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যেই শুরু হয় রূপায়ণের যাত্রা’- বলেন মরিয়ম বেগম।
তবে শুরুর সময়টা ছিল ভীষণ কঠিন। এখনকার মতো জমজমাট ফ্যাশন হাউজের ধারণা সে সময় ছিল না। ছিল না ব্লক প্রিন্ট, স্কিন প্রির্ন্ট বা বাটিকের কাজ শেখার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ইনস্টিটিউট। সে সময় শিল্পী কামরুল হাসান সহজ কৌশল হিসেবে আলু ব্যবহার শুরু করলেন ব্লকের ডাইস হিসেবে। রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হতো পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডের একটি দোকানের রঙ। সেই রঙ কিনে বই পড়ে পড়ে বানানো শিখে তবেই কাপড় রাঙানো হতো। বহু কষ্টে দশ পনেরোটা শাড়ি তৈরি করা হলো প্রথমে। মরিয়ম বেগম এই শাড়িগুলো পোটলা বেঁধে সপ্তাহে দুদিন নিয়ে যেতেন রোকেয়া ও শামসুননাহার হলের সামনে। আলু ও লাউয়ের বোঁটা দিয়ে ব্লক করা এক একটা শাড়ির মূল্য তখন দশ টাকা থেকে সর্বোচ্চ বারো টাকা। লাভ ৫ শতাংশ।
এরই মধ্যে কাঠের নকশা খোদাইয়ের লোক মিলে গেল নবাবপুরে। এরপর নকশায় আসতে শুরু করলো বৈচিত্র্য। একই সঙ্গে দিন দিন এই কাপড়ের চাহিদাও বাড়তে থাকলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠলো এই শাড়ি। বেশিরভাগ শাড়ি হতো সাদা জমিনের মধ্যে, আঁচল ও পাড়ে থাকতো নকশা। নকশায় থাকতো ফুল, লতাপাতা। কখনও কখনও কলসি কাঁখের মেয়ে বা জ্যামিতিক নকশাতেও সেজে উঠতো শাড়ি। নকশাগুলোর আবার সুন্দর সুন্দর সব নামও ছিল; যেমন কলাবতী, শকুন্তলা বা জামদানি। শাড়িগুলোর এতই চাহিদা ছিল যে তৈরির আগেই বিক্রি হয়ে যেত।
মরিয়ম বেগম জানান, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাটের দশক ও সত্তরের দশকেও এসব নকশার চাহিদাও ছিলো তুঙ্গে। ধীরে ধীরে নবাবপুরে নিজ বাড়িতে পুরোপুরি বাণিজ্যকভাবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কাপড় প্রিন্টের ফ্যাক্টরি। নিউমার্কেটে শুরু হলো রূপায়ণের শোরুম।
পটুয়া কামরুল হাসান তনয়া সুমনা হাসান জানান, ১৯৫৬/৫৭ সালের দিকে রূপায়ণ একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে নিয়ে এলো বর্ণমালাখচিত শাড়ি। এর আগে কখনোই নকশায় এরকম অভিনবত্ব নিয়ে কেউ ভাবেনি। নারীরা প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়ার সময় মোটা কালো পাড়ের সাদা শাড়িই বেছে নিত তখন। নিতান্তই সাদামাটা শাড়িতে বাড়তি মাত্রা যোগ করে খানিকটা নতুনত্ব নিয়ে আসার চেষ্টা থেকেই শিল্পী কামরুল হাসান বর্ণমালা নিয়ে আসেন পোশাকে। শাড়ির বিশাল ক্যানভাসজুড়ে খেলা করতে থাকে অ আ ক খ। এই শাড়িগুলো তখন তুমুল সাড়া ফেলেছিল তরুণীদের মধ্যে। বিশেষ করে যারা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন, তাদের জন্য আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় এই শাড়ি।
শুধু বর্ণমালাই নয়, পহেলা বৈশাখকে মাথায় রেখে সুতির সাদা শাড়ি আর টুকটুকে লাল পাড় ও আঁচলের শাড়িও খুব পরতেন তরুণীরা। কয়েক রঙের বল প্রিন্ট করা হতো ব্লকের ডাইস দিয়ে। সেগুলোও লুফে নিয়েছেন তৎকালীন ফ্যাশনপ্রেমীরা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হাজার হাজার টাকার কাঁচামাল লুটপাট হয়ে যায় রূপায়ণের। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থানের দুষ্প্রাপ্যতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আর পেরে ওঠেনি রূপায়ণ। ধীরে ধীরে কার্যক্রম থেমে যায় এর।
©️ Bangla tribune