03/06/2026
হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি তার এ পোস্টে বনলতা এক্সপ্রেসের গল্প, দর্শন ও আবেগের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—বিতর্ক কি গল্পের সৌন্দর্য নিয়ে, নাকি এর প্রদর্শন নিয়ে?
একটি সিনেমায় মানবজীবনের দুঃখ, মৃত্যু, ভালোবাসা, আশা, সংগ্রাম—এসব বিষয় থাকলেই সেটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না। পৃথিবীর প্রায় সব শিল্পকর্মই মানুষের আবেগ নিয়ে কথা বলে। কিন্তু আবেগ কোনো কিছুর বৈধতার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
চোরের গল্পেও আবেগ থাকে, প্রেমের গল্পেও কান্না থাকে, ট্র্যাজেডিতেও দর্শন থাকে। তাই বলে কি কেবল আবেগ সৃষ্টি করতে পারলেই সবকিছু গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়?
বনলতা এক্সপ্রেসের সমর্থকেরা সিনেমার গল্প নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু আলেমসমাজ কথা বলছেন একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রবণতা নিয়ে। তারা প্রশ্ন তুলছেন—সিনেমা শিল্প সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এর মাধ্যমে কী ধরনের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
কেউ যদি সিনেমা দেখতে চান, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ। আবার কেউ যদি মনে করেন সিনেমা সংস্কৃতি সমাজে নৈতিক বা ধর্মীয় ক্ষতি ডেকে আনে, তাহলে তারও শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানানোর অধিকার আছে। গণতন্ত্রে শুধু প্রদর্শনের স্বাধীনতা নেই; প্রতিবাদের স্বাধীনতাও আছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, একটি সিনেমার বিরোধিতা করলেই সেটাকে মানবজীবনের বিরোধিতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। যেন বনলতা এক্সপ্রেস বন্ধ মানেই জীবন, কান্না, আশা, সংগ্রাম বন্ধ!
না, মানবজীবনের গল্প সিনেমার আগেও ছিল, সিনেমার পরেও থাকবে। সন্তানের কফিন নিয়ে বাবার কান্না, মায়ের অসহায়তা, মৃত্যুর মুখে মানুষের আত্মসমর্পণ, নতুন জীবনের সূচনা—এসব সত্য কুরআন, হাদিস, ইতিহাস ও সাহিত্যে বহু আগেই বর্ণিত হয়েছে। মানবতার একচেটিয়া ঠিকাদার কোনো চলচ্চিত্র নয়।
জন্মের সময় আযান আর মৃত্যুর সময় জানাজার যে গভীর সত্যের কথা বলা হয়েছে, সেই সত্যই তো আমাদের শেখায়—জীবন শুধু আবেগের নাম নয়; জীবন জবাবদিহিতারও নাম। মানুষ শুধু অনুভূতির জন্য সৃষ্টি হয়নি, হেদায়েতের জন্যও সৃষ্টি হয়েছে।
তাই আলেমসমাজ যদি মনে করেন কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে তারা সেই বিষয়ে কথা বলবেন। এটি তাদের সাংবিধানিক, নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার।
সিনেমার পক্ষ নেওয়া যেমন অধিকার, সিনেমার বিরোধিতা করাও তেমনি অধিকার। কিন্তু এক পক্ষকে “সংস্কৃতির রক্ষক” আর অন্য পক্ষকে “অন্ধকারের শক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করা বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নয়।
বাংলাদেশের মানুষ ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, জাতীয় পরিচয়ের অংশ মনে করে। তাই এ দেশের সাংস্কৃতিক বিতর্কে ইসলামি মূল্যবোধের উপস্থিতিকে অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক বলে দেখানো বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
তবে মনে রাখা ভালো, বাস্তবে বিতর্কিত কোনো সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আক্রমণ না করে নীতি, যুক্তি ও সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে সমালোচনা করা সাধারণত বেশি কার্যকর ।
মুফতি সাঈদ আহমাদ
শিক্ষক, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর