02/11/2023
যেতে হবে অন্য কোথাও!
দ্যুতিময় বুলবুল
দ্বিতীয় পর্ব
পরদিন সন্ধ্যায় মা বাবা দু’জনেই ডাক্তারের কাছে গেছেন। আমাকে কোনো কিছু না জানিয়েই। রিপোর্টগুলো সঙ্গে নিয়ে গেছেন তারা। ফিরলেন রাত ১১টার দিকে। দু’জনেই নির্বাক, নিস্তব্ধ, গম্ভীর। মুখ মলিন। চোখে কান্নার ছাপ স্পষ্ট। আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছেন না তারা। বহু কষ্টে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, মা খেয়েছো? তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই দ্রুত ঘরে ঢুকলেন তিনি। পিছনে মা। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, বাবা মা কাঁদছেন। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, এবার পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হবে!
মা বাবার অবস্থা বুঝলাম। তাই ভাবলাম, এখন আর তাদের কাছে যাব না। সরাসরি আমার ঘরে গিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পড়লাম। নানা দুঃচিন্তা। ঘুম আসে না কিছুতেই। ঘুমের বুড়ি নিরুদ্দেশ। দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। কে যেন অদৃশ্য থেকে বলছে, মায়া এই পৃথিবী আর তোমার না। পৃথিবীর মায়া ছাড়ো। যেতে হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “হেথা নয়, হেথা নয়, আর কোন্খানে।”
অজানা আশঙ্কা, মূলত মৃত্যু ভয় তাকে তাড়া করছে। অবচেতন মনে মায়ার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, তার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের "প্রাণ" কবিতার চরণ- "মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। /এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে/ জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।”
মানুষ মরণশীল। মানবজীবনে মৃত্যুই সবচেয়ে বড় ও চিরন্তন সত্য। হয়তো দু’দিন আগে অথবা পরে। কিন্তু মানুষ এ চিরন্তন সত্য মানতে চায় না। মানতে চায় না, ‘জন্মিলে মরিতে হইবে’। বরং এ সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে চায় মৃত্যুহীনভাবে। আমার প্রাণের আকুতিও তাই।
এই বিশ্বচরাচর বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে মানুষকে। তাই মানুষ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায় না, অনন্তকাল এই বিশ্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায় । অথচ মানুষ জানে এই পৃথিবীতে কোনো জীবনই চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। তবুও মানুষ এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে জীবনকে আঁকড়ে ধরতে চায়।
অপার সৌন্দর্য আর একইসঙ্গে নয়নাভিরাম ও বৈচিত্রময় পৃথিবীতে আপনজনের মায়ার বন্ধন কেউই ছাড়তে চায় না। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বেঁচে থাকতে চায়। এই সুন্দর পৃথিবী সব মানুষের কাছে পরম আপন। তাই মানুষ এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যেতে চায় না। পরিবার-পরিজন নিয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য ও আনন্দ উপভোগ করতে চায়। পৃথিবীর প্রতি মানুষের এই ভালোবাসা অকৃত্রিম। তাই মৃত্যু অবধারিত জেনেও মানুষ এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চায় না। এই অমরত্বের প্রার্থণা মানুষের চিরন্তন। সকলের কাছেই পৃথিবী সুন্দর। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কেউ পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিতে চায় না।
এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দেখলাম, বাবা মা দু’জনেই খুব নিরবে, চুপিসারে সন্তর্পনে আমার ঘরে ঢুকলেন। লাইট জ্বালালেন না। ডিম লাইটের আলো আধাঁরির মধ্যেই তারা দু’জনেই আমার বিছানায় পাশে বসলেন। ভাবলেন, আমি ঘুমিয়ে গেছি। মা বাবা দু’জনেই আমার মুখে হাত বুলালেন। আমি স্পষ্ট দেখলাম, তারা কাঁদছেন। তাদের দু’জনেরই চোখের জল আমার গালে টপটপ করে পড়ল। আমি বহু কষ্টে কান্না চেপে গেলাম। ঘুমের ভান করে মরার মতো শুয়ে থাকলাম। কোনো নড়াচড়া করলাম না। যাতে তারা টের না পান, আমি জেগে আছি।
সকালে বিছানা থেকে উঠেই শুনলাম, বাবা বাইরে গেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, এতো সকালে কেন? মা বললেন, তোমার বাবা অ্যাম্বাসিতে গেছে, ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে। ব্যবসার কাজে শিগগিরই তাকে সিঙ্গাপুর যেতে হবে। হঠাৎ সিঙ্গাপুরে ব্যবসার কাজে! আগে তো জানতাম না, বলল মায়া। জবাবে মা বললেন, অনেক আগেই তার যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যাই যাই করতে করতে যায়নি। এখন না গেলেই নয়। ভাবছি- তুমি, আমিও তার সঙ্গে বেড়াতে যাব। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় না। একটু দেশের বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
মায়ার সন্দেহটা আর সংশয়ের মধ্যে রইলো না। কঠিন সত্যে রূপ নিলো। হয়তো দেশে তার ভালো চিকিৎসা নাই। তাই তাকে সিঙ্গাপুর নেয়া হচ্ছে। কিন্তু মাকে সে হা-না কিছুই বলল না। চুপচাপ ঘরে চলে গেল। তবে যাওয়ার আগে পিছন ফিরে দেখলো, মায়ের চোখে জল। মায়ার বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলো না। সে শুয়ে পড়ল বিছানায়।
কেন জানি আজ মায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বন্ধু-বান্ধবীদের কথা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত, ছবির মতো সাজানো গোছানো ক্যাম্পাসটাও ভীষণভাবে টানছে। বিশেষ করে মারুফের হাসি খুশি সহজ সরল প্রেমময় মুখটা ভেসে উঠছে তার মনের অলিন্দে। জ্বলজ্বল করছে তার স্বপ্নময় দুটি চোখ। বুক ভরা অকৃত্রিম ভালোবাসা- True and Profound Love যাকে বলে।
মায়া ভাবছে, আজ তিনদিন দেখা হয়নি কারো সঙ্গে। কথা হয়নি মারুফের সঙ্গেও। প্রতিদিন সে ফোন করেছে। একদিনও ধরিনি। সে হয়তো খুব মানসিক কষ্টে আছে। সত্যিই মারুফ আমাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু এই ভালোবাসায় কী লাভ, দুঃখ ছাড়া তো আর কিছু প্রাপ্তি নেই! তাকে তো কিছু বলতেও পারছি না। তবুও একটা ফোন করি। কথা বলে নিজে কিছুটা হালকা হই, ওকেও হালকা করি। এই ভেবে মোবাইল ফোনটা হাতে নিতেই মারুফের Call এলো। কী ব্যাপার, তুমি ফোনটা ধরছো না কেন? তিনদিন ধরে ক্লাসেও আসছো না। Is there anything wrong? এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল মারুফ।
মায়া প্রচণ্ড আবেগ প্রবণ হয়ে উঠেছে। দু’চোখ বেয়ে জল পড়ছে। মুখে কথা সরছে না। তবুও জোর করে সে বলল, আরে তেমন কিছু না। দু’দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম পারিবারিক কাজে। তাছাড়া খুব শিগগিরই বাবা মা’র সঙ্গে সিঙ্গাপুর বেড়াতে যাব। তাই একটু গুজগাজ করছিলাম- এই আর কি। চিন্তার কিছু নেই। কাল আমি ক্যাম্পাসে আসছি। ক’দিন ধরে সবাইকে মিস করছি। তোমাদের না দেখে ভালো লাগছে না। বিশেষ করে ক্যাম্পাসটা খুব টানছে, টানছো তুমিও।
অনেকটা ভারমুক্ত হলো মারুফ। যেসব দুঃচিন্তা সে করেছিল, হয়তো সেসব কিছু না। ক’দিন ধরেই তার ঘুম হয়নি। নাওয়া-খাওয়ার প্রতি আগ্রহও তার ছিল না। আজ রাতে সে ভালোমতো খাবে। তারপর টানা একটা ঘুম দেবে। সকালে সবার আগে সে ক্যাম্পাসে যাবে। মায়াকে স্বাগত জানাবে। সারাদিন তার সঙ্গে ক্যাম্পাসে ঘুরবে, গল্প করবে, হাসিঠাট্টায় মেতে উঠবে। ক্যাফেতে দুপুরে একসঙ্গে খাবে। মুক্তমঞ্চের সামনে লাল ইটের বেঞ্চে বসে আড্ডা দেবে। যেন কতদিন মায়ার সঙ্গে তার সঙ্গে দেখা হয়নি, কথা হয়নি!
পরদিন সকাল সকাল ক্যাম্পাসে এলো মায়া। দেখলো, কলাভবনে ক্লাসরুমের সামনে অধীর আগ্রহে চাতক পাখির মতো পথের দিকে চেয়ে আছে মারুফ। মায়াকে দেখেই সে অস্থিরভাবে সামনে এগিয়ে গেলো। কিন্তু একি! মায়ার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। ধীর স্থির নিস্তরঙ্গ। তার হাসি-খুশি মুখটা অত্যন্ত মলিন, নিষ্প্রভ।
অনেক বদলে গেছে মায়া। কোনো উল্লাস নেই, উত্তাপ নেই। সাজগোজ করেনি। এলোমেলো চুল। চোখের কোনায় কালি পড়েছে। তিনদিনেই যেন অর্ধেক শুকিয়ে গেছে! হতাশ ও উদাস ভঙ্গিতে তার দিকে চেয়ে আছে। মুখের কথা সরছে না। মনে হচ্ছে চোখে বিন্দু বিন্দু জল। অবাক বিস্ময়ে হতবাক মারুফ। মায়ার চেহারার এ অবস্থা দেখে তারও যেন মুখ থেকে কথা বেরুচ্ছে না। তার বাঁধভাঙা উল্লাস ও উচ্ছ্বাস থেমে গেছে। কারণ, এমন মায়াকে সে কখনো দেখেনি। (চলবে)
, , , , , , , , , .
#ভালোবাসা, #প্রেম, #প্রেম_কাহিনি, #গল্প, #প্রেমিক, #প্রেমিকা, #ট্রাজেডি, #রোমান্স, #বিনোদন, #খাঁটি_প্রেম, #সত্যিকারের_ভালোবাসা, #গভীর_ভালোবাসা, #বিশ্ববিদ্যালয়, #ক্যাম্পাস।