06/11/2024
হুজুরের ছোট ছেলে Abu Salman Md Ammar
এর টাইমলাইন থেকে :
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পি এল সি, আলহাজ্ব শফি উদ্দীন দেওয়ান এবং একজন আল্লামা লুৎফর রহমান !
(১ম ছবি : দেওয়ান চাচার সাথে বাবা [] ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৬
স্থান: দেওয়ান মঞ্জিল, ৬০/ই, পুরানা পল্টন, ঢাকা ।)
তখন মাত্র বাংলাদেশ সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা (Banking system without interest) নিয়ে প্রাথমিক আলাপ চলছিল ।
ধারাবাহিকভাবে সে আলাপচারিতার মাধ্যমে ডানপন্থি আমাদের ঘরানার কার কার বড় ফান্ড আছে, বড় ব্যাকাপ আছে - এমন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছিল ।
ব্যাংক এর স্পন্সর হতে পারবেন এমন কিছু বড় বিজনেসম্যানকে খুঁজে বের করতে হবে । ৫/১০ লাখ টাকা সেই আশির দশকের শুরুর দিকে যাঁরা একদাগে দিতে পারবেন এমন লোক বের করতে হবে । উক্ত ইনভেস্ট এর টাকাগুলো ব্যাংক দাঁড় করাতে পারলে তো হলো-ই । যদি নাকি স্রোতের বিপরীতে সুদমুক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এই মহাপরিকল্পনা ভেস্তে যায়, পুরো প্লানটা যদি লস প্রজেক্টে পরিণত হয় তাহলে স্পন্সর হিসাবে যাঁরা ৫/১০ লাখ টাকা দিয়েছেন তাঁদের সে টাকা সুদের বিপরীতে শরীয়াহ ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নিয়্যতে ইনভেস্ট করায় ফি সাবিলিল্লাহ খাতে পরকালীন পুঁজিতে অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে !
সে সময়ের ১ টাকা মানেই যখন বহুকিছু !
সেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা !
তাও আবার এই শর্তে যে, যদি ব্যাংক সাকসেস করা না যায় কোন টাকা-ই ফেরত পাওয়া যাবে না !
ম্যাচিওর বিজনেসম্যান তখন আমাদের ঘরানায় হাতে গুনা দুই একজন ! সেই স্বাধীনতা পরবর্তী কঠিন সময়েও যাঁদের ১৫/২০ লাখ টাকা দেয়ার সামর্থ আর মানসিকতা দুটোই আছে ।
তাঁদের মধ্যে প্রথমজন হলেন “আলহাজ্ব শফি উদ্দীন দেওয়ান” চাচা । তাঁর যেমন ছিল সামর্থ আল্লাহ মনটাও ঠিক তেমন-ই বড় দিয়েছেন । স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই যিনি ছিলেন অনেক বড় মাপের শিল্পপতি ।
[][]
এবার একটু পেছনে ফিরে যাই:
স্বাধীনতার পরেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আমাদের বিপরীতমূখী অবস্থানে । ঘটনাটি স্বাধীনতার ২/১ বছর পরের ! নারায়নগঞ্জ এর ফতুল্লায় বাবার বড় একটি মাহফিল ছিল ।
মাহফিলটি দেওয়ান চাচার “দেওয়ান ফ্যাশন” নামের একটি গার্মেন্টস এর পাশেই ছিল ।
কৌতুহল বশত সেদিন দেওয়ান চাচা বাবার মাহফিল শুনতে এসেছিলেন । মনযোগ দিয়ে পুরো সময়টা-ই মাহফিল শুনলেন ।
কেমন যেন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন !
মাহফিল শেষ করতেই ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরলেন ! বললেন, মাওলানা আপনার পরিচয় দিন ! বাড়ি কোথায়?
থাকেন কোথায় ?
বাবাও সুযোগটা কাজে লাগালেন । তবে ব্যক্তি স্বার্থে নয়, শতভাগ দ্বীনের স্বার্থে ! বাবা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে দেওয়ান চাচাকে সবচেয়ে বেশি আপন করে নিলেন । ঠিকানা, বাড়ি সব বললেন । বাবা মাহফিল শেষ করে সেদিন লঞ্চে করে চাঁদপুর হয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার কথা । দেওয়ান চাচা বাবাকে নিয়ে নিজের গাড়িতে করে সরাসরি গুলশানের বাসায় চলে আসলেন । একসাথে খেলেন । বাবার আজীবনের জন্য পাঠাগারসহ থাকার ব্যবস্থা করলেন নিজের বাসায় । সংগঠনের একনিষ্ঠ একজন কর্মী হিসাবে নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করলেন, সেই সাথে আমৃত্যু সংগঠনের বড় একজন ডোনারে পরিণত হলেন । সংগঠনের স্বাধীনতা পরবর্তী নীতি নির্ধারক দায়িত্বশীলগন “আলহাজ্ব শফি উদ্দীন দেওয়ান মানেই মাওলানা লুৎফর রহমান এবং মাওলানা লুৎফর রহমান মানেই আলহাজ্ব শফি উদ্দীন দেওয়ান” এটাই বুঝতেন, এটাই জানতেন । কারন সেই রাতের পরিচয়ের পর থেকে দুজনকে দেশে বিদেশের কোন সফরে কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি ।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাবাকে তিনি হাতছাড়া করেননি । যাঁরা পরবর্তীতে পল্টনের ৬০/ই দেওয়ান মঞ্জিলকে চিনতেন সেটা বহু পরের ঘটনা । বাবাসহ দেখে শুনে একাধিকবার ভিজিট করে দেওয়ান চাচা ঐতিহাসিক সেই “দেওয়ান মঞ্জিল” এর ৪০ কাঠা জমি তৎকালিন ৭০,০০০ টাকা প্যাকেজ মূল্যে ক্রয় করেছিলেন । একই সময়ে বাবাকেও ৫ কাঠা জমি সেখানে নিয়ে দিতে চাইলেন । বাবা রাজি হলেন না । বাবা বললেন, আমি গ্রামে থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করি । যাই হোক, পরবর্তীতে দেওয়ান চাচা পল্টনের সেই জমিতে বাড়ি করে গুলশান থেকে বাবাকেসহ বাসা শিফট করেছিলেন ।
[][]
আবার ব্যাংক এর প্রসঙ্গে আসি :
যে বাবাকে এতো ভালবেসে নিজের জীবনের সাথে পরিপূর্ন একাকার করে নিলেন সে বাবার কোন প্রস্তাব কখনো তিনি ফিরিয়ে দিতেন না । দিতে পারতেনও না ! ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পি এল সির ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছিল !
বাবা দেওয়ান চাচাকে দুনিয়া আখেরাত দুই জায়গার-ই বিশাল সফলতার কথা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন । দু- বন্ধু একসাথেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত প্রত্যয়ে ।
তৎকালিন একজন বড় মাপের শিল্পপতির সাথে হাই লেভেলের বিজনেসম্যানদের ভাল সম্পর্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক । বাবা সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেওয়ান চাচাকে নিয়ে টিম ওয়ার্ক করে দেওয়ান চাচাসহ মোট বড় মাপের ৪ জন স্পন্সর কনফার্ম করে ফেললেন ইসলামী ব্যাংক এর জন্য ।
আলহামদুলিল্লাহ ।
ব্যাংক এর সুচনাটা এভাবেই এক দূরন্ত গতি পেয়ে যায় । ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় আলহাজ্ব শফি উদ্দীন দেওয়ানদের বিগ ইনভেস্ট এর নেপথ্যে মাওলানা লুৎফর রহমানদের দ্বীনি অনুভূতির নি:স্বার্থ ফুয়েল সাপ্লাই যে অবদান রেখেছে তা হয়তো বর্তমান প্রজন্ম আর জানার সুযোগ নেই । যাঁরা এই বিশাল অবদানের স্বীকৃতি দিতেন তাঁরা অনেকেই দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন । অবশ্য মাওলানা লুৎফর রহমান সাহেবরা দুনিয়ার স্বীকৃতির জন্য কিছুই করেননি । সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছিলেন ।
প্রতি রমজানে হেড অফিসের উদ্যোগে একটি ইফতার প্রোগ্রাম এর আয়োজন করা হতো । বাবা থাকতেন প্রধান অতিথি ।
তখন ২০০৭ সাল । স্থান ছিল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল । বাবার সাথে আমিও সেদিন ইফতার প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম ।
[][]
বাবার সেদিনের বক্তব্যের চুম্বকাংশ লিখছি:
“আমরা যখন সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করলাম তখন বিরুদ্ধবাদীরা বলতে শুরু করলো: সুদমুক্ত ব্যাংক? এটা -হবে না -হবে না -হবে না !
ব্যাংক যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল তখন তারা অপপ্রচার চালাতে শুরু করলো:
এটা -রবে না- রবে না- রবে না !
ব্যাংক যখন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিশাল খ্যাতি অর্জন করে ফেলল তখন তারা বলতে শুরু করলো: এটা আমাদের গায়ে
-সবে না -সবে না -সবে না !
ব্যাংক যখন একের পর এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে শুরু করলো তখন তারা বলতে লাগলো: এতো ভালোও
-ভালো না -ভালো না -ভালো না !
আলহামদুলিল্লাহ !
বিরুদ্ধবাদীদের অবমাননার সর্বোত্তম জবাব দিয়ে আজকে ইসলামী ব্যাংক বিশ্ব সেরা ব্যাংক !
পুরো হলরুম জুড়ে উল্লাস উৎফুল্লে যেন একটা বিজয়োল্লাস শুরু হলো !
আবু নাসের মুহাম্মদ আ: জাহের চাচা চেয়ার থেকে উঠে বাবার কপালে একটানা চুমু খাচ্ছিলেন আর কাঁদছিলেন !
এভাবেই নাসের চাচা, শহীদ মীর কাশেম আলী চাচাদের দক্ষ হাতে নেপথ্যে কিছু ত্যাগী মানুষের অবিরাম নি:স্বার্থ শ্রমে বিশ্ব সেরা ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পি এল সি ।
আল্লাহ মরহুম শফি উদ্দীন দেওয়ান চাচা, আমার পরম প্রিয় বাবাসহ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সূচনায় যাঁরা অসমান্য অবদান রেখেছেন সর্বোপরি যাঁদের দৃঢ় পাকাপোক্ত আর দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক একটি শক্তিশালী ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া আখেরাতে সর্বোচ্চ বিনিময় দান করুন । প্রিয় এই প্রতিষ্ঠানকে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে দিন । আমিন ।