01/03/2026
অমর একুশে বই মেলার মাঠে তীব্র ভিড়। মেলা বরাবরের মতো দুই অংশে বিভক্ত। একটা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ, যেখানে সমস্ত সরকারি প্রকাশনা আর ম্যাগাজিনগুলো স্টল পায়। আরেকটা রাস্তার ওপাশে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে, যেখানে সবাই স্টল পায়।
পাঠকের অতি আগ্রহ দেখে কিছু ইনফ্লুয়েন্সাররা মেলায় লাইভ করে বেশ সমালোচনা ক্রিয়েট করে ফেলেছে। আজ সকালে বাংলা একডেমির মহাপরিচালক ডেকে পাঠিয়েছিলেন প্রকাশক আবরার আবীরকে। জানতে চেয়েছিলেন স্টলে ছাগল রাখার কারণ। রেগে মেগে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি কী সিম্বলিকভাবে লেখকের চেয়ে ছাগল জনপ্রিয় এটা বুঝাতে চান?
প্রকাশক আবরার আবীর অত্যন্ত ধৈর্য্য নিয়ে শুরু করেছিলেন, “ভাই?”
মহাপরিচালক ক্ষেপে উঠে বলেছিলেন, “ভাই বলবেন না, আমাকে স্যার ডাকবেন।”
“জ্বি অবশ্যই, আসলে আমার ভুল আপনার নাইটহুড প্রাপ্তির এত বড় খবরটা আমি এখনও পেয়ে উঠিনি তো!”
“আপনি আমার সাথে ফাইজলামি করেছেন?”
“শুরু তো আপনি করলেন।”
“টু দ্যা পয়েন্টে আসেন, আপনি স্টলে ছাগল রেখে বাংলা একাডেমির সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছেন। অমর একুশে বইমেলার মর্যাদা ধুলায় লুটিয়েছেন।”
“আসলেই?”
“মানে?”
“মানে ছাগলের এত ক্ষমতা?”
“ছাগলের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখবেন না। ছাগল কেলেঙ্কারিতে সরকারি আমলার চাকুরিচ্যুতি দিয়ে ঘটনা শুরু হলো, তারপর এই ছাগলের সূত্র ধরেই দেশটাই বদলে গেলো। গেলো না?”
“তা গেলো। তাহলে আপনি মানছেন ছাগল গুরুত্বপূর্ণ।”
“অফকোর্স গুরুত্বপূর্ন। দেশের এই পরিস্থিতিতে একমাত্র ছাগল ছাড়া কেউ ছাগলকে অগুরত্বপূর্ণ ভাববে না।”
“তাহলে ছাগল সরাতে বলছেন কেন?”
নিজের কথার প্যাঁচে নিজে পড়ে গিয়ে বিব্রত হয়ে ওঠেন একাডেমী পরিচালক। “আপনি কথা ঘুরানোর অপচেষ্টা করছেন। আপনার বিরুদ্ধে ডিরেক্ট কমপ্লেইন এসেছে।”
“সে আসতেই পারে। পুরো মেলাতে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগও কম ছিল না।”
“আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ?” চোখ কপালে উঠে যায় মহাপরিচালকের।
“হ্যাঁ, প্রথমে শুরু হলো, তৌ… জনতা, না এই নাম নিলে তো তারা আবার আমার দোকান ভাঙবে। তারপর স্যানিট্যারি ন্যাপকিনের কাহিনী হলো। অথচ আপনারা অর্গানাইজাররা পাঠকদের জন্য কোন সুবিধা রাখেননি।”
“সমস্ত সুবিধা রাখা হয়েছে।”
“বাল, রাখা হয়েছে।”
“আপনি কী স্ল্যাং ব্যবহার করলেন মাত্র?”
“আপনি কী তাই শুনলেন? আপনি কানের ডাক্তার দেখান ভাই…থুক্কু স্যার।”
“আপনি আবার পয়েন্ট থেকে সরে যাচ্ছেন। পাঠকের কী সুবিধা রাখা উচিত ছিল?”
“মেলায় খুব সহজে স্টল নম্বর বিন্যাস করতে পারতেন। কোন সারিতে কোন কোন নম্বর সেটা রোড পয়েন্টার দিয়ে চিহ্নিত করতে পারতেন। পয়েন্টার দিতে আর কয় পয়সা লাগে? আর টাকা তো আপনার পকেট থেকেও দেয়া লাগে না। স্পন্সর দেয়। আপনার শুধু কষ্ট করে এজেন্সিকে বলতে হবে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, এরপর তো বলবেন এজেন্সিকে বলে গুগল ম্যাপের মতো আস্ত একটা ম্যাপ লঞ্চ করতে।”
“গুড আইডিয়া, আরে ভা…থুক্কু স্যার, আপনার মাথায় তো দেখি ভালই আইডিয়া আছে। তাহলে বাস্তবায়ন করেন না কেন? হ্যাঁ, এই ম্যাপটা নেটে ছড়িয়ে দেন। পাঠক দেখে আরামসে বুঝে যাবে কোন দিকে কোন স্টল। শুধু নম্বর দিয়ে স্টল চিহ্নিত কেন করবেন? প্রাকশনীগুলোর নামও সেই ম্যাপে থাকতে পারে। তাতে মানুষের খুঁজে পেতে সুবিধা হবে।”
“আর কী কী করতে হবে শুনি?” মুখ কালো করে বললেন মহাপরিচালক।
“মেলা এবার এত বড় এলাকায় ছড়িয়েছেন সেটা খুবই ভাল কথা। আশার কথা। কিন্তু বসার কোন ব্যবস্থা রাখেননি কেন? ইভেন্ট প্ল্যানারের কয় পয়সা খরচ হয় কয়েকটা বেঞ্চ দিতে। আমার মতে গায়ে গায়ে স্টল না দিয়ে ফাঁকা করে দেয়া উচিত। মাঝের অংশটা বাড়ানো উচিত আর প্রত্যকে স্টলের মাঝে পিঠাপিঠি এক জোড়া বেঞ্চ দেয়া উচিত। সেই বেঞ্চের পাশে থাকবে পানির ফিল্টার। মেলায় পানি কিনে খেতে হলেও দেড় মাইল হাঁটতে হয়। দেশ এগোচ্ছে আর আপনারা পেছাচ্ছেন। মানুষকে কমফোর্ট দেবেন না আর আশা করবেন মানুষ এমনি এমনি বই কিনবে!”
“লেকচার দেবেন না। আমি প্রফেসর, লেকচার দেয়া আমার কাজ, আপনার না। বাংলা একাডেমী মেলা আয়োজনে বাধ্য না।”
“অবশ্যই। তাহলে আমাদের প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দেন। দেখেন, মেলা কত প্রকার এবং কী কী ভাবে আয়োজন করা সম্ভব। গ্যারান্টি দিয়ে বলতেছি কোন বিপ্লবী জনতার হাতে একজন লেখকও হেনস্তা হবে না।”
“আপনি ব্যবসায়ী আপনি শিল্প এবং কলা বুঝবেন না। ঐটা আমাদের কাজ অযথা নিজের নাক গলাবেন না। বুঝেছেন?”
“জী বুঝলাম।”
“কী বুঝলেন?”
“আপনি সাহিত্যের দারোয়ান।”
“হোয়াট? আবার ফাইজলামি শুরু করছেন।” মহাপরিচালক এত রেগে গেলেন যে তার নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। তিনি রাগান্বিত গলাতেই বললেন, “আপনার বিরুদ্ধে মেলার নিয়ম ভঙ্গের লিখিত অভিযোগ আছে।”
“কই দেখি অভিযোগ?” হাত বাড়িয়ে দিলেন আবরার আবীর।
মহাপরিচালক ড্রয়ার হাঁতড়ে একটা ফুলস্কেপ কাগজ বের করে দিলেন। আবরার আবীর পড়ে দেখলেন পুরোটা। ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় নিলেন তিনি। ক্ষমতাশালী লোকদের অপেক্ষা করাতে সবারই ভাল লাগে।
“এই সচেতন সাহিত্যিক সমাজ কারা?” সময় নিয়ে চিঠি শেষ করে জিজ্ঞাসা করলেন প্রকাশক আবরার আবীর।
“নিচে নাম লেখা আছে সবার।”
“পড়লাম কিন্তু এদের কাউকে চিনি বলে তো মনে হচ্ছে না। এদের দুই একটা বইয়ের নাম বলবেন প্লিজ?”
“সেটা আমার দায়িত্ব না।”
“আচ্ছা, তো আপনার দায়িত্ব কী?”
“অভিযোগ আসলে সত্য মিথ্যা যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”
“আচ্ছা, কিন্তু অভিযোগ তো মিথ্যা।”
মহাপরিচালক চোখ কপালে তুলে বললেন, “মিথ্যা? আমি নিজে আপনার প্যাভিলিয়নে ছাগল দেখেছি।”
“হ্যাঁ, দেখেছেন, তো?”
“তাহলে মিথ্যা হয় কী করে?”
“আপনার অভিযোগ পত্রে কী লেখা আছে?”
মহাপরিচালক ঝুঁকে চশমা ঠিক করে পড়লেন, “এই তো স্পষ্ট লেখা আছে- আফসার ব্রদার্সের প্যাভিলিয়নে খাসি রাখার দরুন অমর একুশে বই মেলার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ায় যথোপোযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান।”
“হ্যাঁ, এই অভিযোগ সত্যি না।”
“আমি নিজে আপনার প্যাভিলিয়নে ছাগল দেখেছি। আপনি বলতে চান কানের মতো আমার চোখেও সমস্যা?”
“না, আপনি ঠিক দেখেছেন।”
“তাহলে আপনি অভিযোগ মিথ্যা বলছেন কী করে?”
“মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলব কেন? আপনার অভিযোগ তো ছাগল নিয়ে না খাসি নিয়ে। আমার দোকানে কোন খাসি নেই। আমার দোকানে আছে পাঠা। সেটাকে খাসি করা হয়নি। বিশ্বাস না হলে আপনি নিজে হাতিয়ে দেখে আসতে পারবেন। পাঠা আর খাসির পার্থক্য জানেন তো। পাঠার অপারেশন করে যখন…”
মহাপরিচালক তড়িঘড়ি করে বললেন, “জানি জানি, আপনাকে অশ্লীল শব্দাবলি আর মুখে বলতে হবে না।”
“আপনার মুখে বাংলা শুনে ভাল লাগল।”
“এতক্ষণ কী তাহলে ইংলিশে কথা বলছিলাম?”
“না, তবে ভাষার মাসেও আপনি প্রচুর ইংলিশ শব্দ ব্যবহার করছিলেন। যাহোক খাসি যেহেতু নেই, সেহেতু অভিযোগ আর বহাল থাকে না। আমি উঠি, কী বলেন?”
“আজকের ভেতরে কিন্তু ছাগল নিয়ে অভিযোগ চলে আসবে।”
“আসুক। আজ মেলার শেষ দিন, অভিযোগ আসতে আসতে মেলাও শেষ হয়ে যাবে।”
“আগামী বছর প্যাভিলিয়ন পাবেন না।”
“সরি ভাই, ভাই বলেই বললাম। একটা পরামর্শ দেই। আপনি বাংলা একডেমির মহাপরিচালক থাকবেন কত দিন? আমাদের বইয়ের ব্যবসা তিন পুরুষের। মেলায় একটু ব্যবসা ভাল হয়। কিন্তু মেলা দিয়ে আমাদের পেট চলে না। থ্রেট যাকে দিলে কাজে লাগবে তাকে দিবেন, প্লিজ অপাত্রে দেবেন না, তাতে নিজেকে ধ্বজভঙ্গ বলেই প্রমাণ করবেন। লোকে ইতোমধ্যে আপনার ব্যর্থতার জন্য মহাপরিচালকের বদলে মরাপরিচালক বলা শুরু করেছে। যাক গে, আসি স্লামালিকুম।”
একাডেমি থেকে থেকে বের হয়ে এসে তিনি প্যাভিলিয়নের ভেতরে এসে বসেছেন। দুপুরের পর থেকে পাঠকদের সাড়া দেখে মন ভাল হয়ে গেছে তার। তিন লেখক আসতেই জমে উঠেছে ব্যবসা। জাহিদ হোসেন তো এসেছেন সেই সুদূর সিলেট থেকে। সব মিলিয়ে পাঠকদের উৎসাহে দেদারসে বইও বিক্রি হচ্ছে। বইমেলা আসলে তো এমন উৎসব মুখরই হওয়া উচিত।
সিদ্দিক আহমেদের “মৎস্য মারিব খাইব সুখে” পড়েছেন তো? সংগ্রহ করুন লেখকের সব থেকে জনপ্রিয় অতিপ্রাকৃত অপন্যাস!
#অতিপ্রাকৃত
#পৃথিবীর_সবচেয়ে_ভালো_বন্ধুর_নাম_বই