03/02/2025
ফাইন মোটর স্কিল (Fine Motor Skill) কী?
মানুষ যে কারণগুলোর জন্য পৃথিবীর অন্যান্য সকল প্রাণীদের চেয়ে উন্নত তার একটি হলো তার সূক্ষ্ম মোটর কন্ট্রোল স্কিল। মোটর কন্ট্রোল স্কিল বা ডেক্সটারিটি হলো শরীরের সূক্ষ্ম মাংশপেশিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে হাত ও আঙ্গুল নাড়ানোর ক্ষমতা। আমরা সূক্ষ্মভাবে হাতের আঙ্গুলগুলোকে ব্যবহার করতে পারি বলেই আমরা হাত দিয়ে লেখালেখি, ছবি আঁকাআঁকি, টাইপিং, বিভিন্ন সুক্ষ্ম জিনিস তৈরি ইত্যাদি যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারি যা প্রাণীজগতের অন্য কোনো প্রাণী এত সহজে করতে পারে না।
ফাইন মোটর স্কিল সাধারণত হাতের ছোট ছোট পেশিগুলোর কাজ ও ব্যবহারের সাথে জড়িত। বিভিন্ন কাজ যেমন পেন্সিল ও কাঁচির ব্যবহার, ব্লক দিয়ে কোনো কিছু বানানো, বোতাম লাগানো বা লাঞ্চ বক্স খোলা, এগুলো ফাইন মোটরের কাজ। যদি আমরা দক্ষতাগুলোকে আরও ভাগ করি তাহলে দেখতে পারবো যে তিনটি জায়গায় শিশুদের ফাইন মোটর স্কিল প্রয়োজন হয়।
★একাডেমিক দক্ষতাঃ
যে কোনো ধরণের পেন্সিল, কলম ঠিকমতো ধরা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সুন্দর করে লিখতে পারা, কাগজ কেটে কোনো ক্র্যাফট বানানো বা সাদা কাগজে দাগাদাগি, রঙ করা, আঁকা ইত্যাদি সবই একাডেমিক দক্ষতার অন্তর্ভুক্ত। শিশুর হাতের লেখা সুন্দর হবে যদি অল্প বয়স থেকেই তার মোটর স্কিল বাড়ানোর দিকে আপনি মনোযোগ দেন।
★খেলার দক্ষতাঃ
খেলতে গেলে হাত পায়ের ব্যবহার থাকবেই। শিশু প্রথমে মুলত হাত দিয়ে খেলে এবং বিভিন্ন জিনিস জোড়া লাগিয়ে গঠন করে। যেমনঃ ব্লক, লেগো বা পাজল্ ব্যবহার করে কোনো কিছু বানানো। ট্রেন ট্র্যাক ব্যবহার করে খেলা। এছাড়া কাপড় কেটে পুতুল বানানো, পুতুল নিয়ে খেলা ও কাপড় পরানো। মোটর স্কিল শিশুদের মধ্যে দ্রুত বাড়ানোর আরেকটা উপায় হলো তাদেরকে এই ধরণের খেলনা কিনে দেয়া। কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার সাথে খেলা।
★নিজের যত্ন নিজে নেওয়ার দক্ষতাঃ
একজন মানুষকে দৈনিক যা যা করতে হয়, সেগুলো করার জন্য ফাইন মোটর স্কিলের ডেভেলপমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমনঃ জুতোর ফিতে বাঁধা, জুতো পরা, চেইন, বোতাম ও বেল্ট লাগানো, চামচের ব্যবহার, লাঞ্চ বক্স বা টিফিন বক্স খোলা,দাঁত পরিষ্কার করা, চুল আঁচড়ানো, প্রসাধনীর ব্যবহার ইত্যাদি।
আমরা যদি উপরের যেকোনো একটা বা সবগুলো ব্যাপারে নিজের সন্তানদের দক্ষতা তৈরি করতে চাই, আমাদের প্রথম কাজ হবে আমার শিশুর মোটর স্কিল ঠিকমতো গড়ে উঠছে কিনা সেদিকে নজর দেওয়া।
★মোটর স্কিল কেন গুরুত্বপূর্ণঃ
জন্মের পর থেকেই শিশু তার চারপাশের জিনিসকে স্পর্শ করে আবিষ্কার করে। শিশু যত বড় হয় তত চারপাশের জিনিসের সাথে তার সখ্যতা বাড়ে। সে অনেক কিছু করতে চায়। তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এই কাজগুলো করা খুবই দরকার। ফাইন মোটর স্কিল এর দক্ষতা মূলত দুটো জিনিসকে প্রভাবিত করে। একটি হলো কাজের কোয়ালিটি এবং অন্যটি হলো কাজের গতি। তাই, যখন বাচ্চা কাগজ কেটে কোনো কিছু তৈরি করতে চায়, তখন যখন দেখে সে অন্য সবার থেকে পিছিয়ে আছে তখন বাচ্চা হতাশ হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশী সমস্যা হয় ক্লাসে লেখার সময়। যখন শিক্ষক কোনো কিছু লিখতে দেয় এবং যারা সময়ের মধ্যে টাস্ক কমপ্লিট করে শিক্ষক তাদের প্রশংসা করেন। তখন যে বাচ্চা পিছিয়ে আছে তার স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ হয়। ফলে তাদের উদ্যম কমে যায়।
কাগজ কাটাকাটি, পেন্সিল ধরা, ব্লক জোড়া লাগানো এইসব কাজ শিশুরা সাধারণত ৩ বছর বয়স থেকেই শুরু করে। যদি তারা একটি কাজ দ্রুত করতে না পারে তাহলে অনেক সময় তারা কাজটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে তাদের একাডেমিক পারফরমেন্সও খারাপ হতে পারে, তাদের খেলার সময়ও অনেক কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তারা আত্মমর্যাদাহীনতায়ও ভোগে। তাই, শিশুদের একাডেমিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য ও নিজের যত্ন নিজে নেয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য তাদের মোটর স্কিল (Motor Skill) এর ডেভেলপমেন্ট খুবই জরুরী।
★ফাইন মোটর স্কিল বাড়ানোর ৩টি উপায়ঃ
ফাইন মোটর স্কিল সাধারণত হাতের ছোট ছোট পেশী ব্যবহার করে কাজ করা। যখন ফাইন মোটর স্কিলে খুব ভালো দক্ষতা চলে আসে তখন শিশুরা কাজের ক্ষেত্রে দারুণ আনন্দ ও স্বাধীনতা উপভোগ করে। যেসব কাজগুলো করতে হাত এবং হাত-চোখ কো-অর্ডিনেশন দরকার সেগুলো করলে ফাইন মোটর স্কিলের বিকাশ হয়।
✅ ১ম উপায়ঃ হাতের পেশী শক্ত করাঃ
আমাদের সব কাজে যেহেতু হাতের ব্যবহার অপরিহার্য সেহেতু এমন ধরনের কাজ বেশী করা উচিৎ যেগুলোতে হাতের কাজ বেশী। এই ক্ষেত্রে বাচ্চাকে প্রথমত কাদামাটি দিয়ে খেলতে দেয়া উচিৎ। বাচ্চা কাদামাটি দিয়ে ইচ্ছেমত শেপ বানাতে পারে। তারপর কাপড় মেলার চিমটা দিতে পারেন। এগুলো দিয়ে ওরা যে কোনো কিছু তারে ঝুলাতে পারে। বাচ্চার আঙ্গুলের পেশি শক্ত করার জন্য রাবার ব্যান্ড দিতে পারেন দু-তিনটা। বাচ্চারা আঙ্গুলের মাঝে রেখে টানাটানি করতে পারে। এছাড়া একহাতে কোনো কাগজ দুমড়েমুচড়ে বল বানিয়ে ফেলা। মনে হতে পারে এ আবার এমন কি! কিন্তু ছোট বাচ্চার জন্য এটা যথেষ্ট কঠিন হতে পারে। এগুলো করলে হাতের পেশী শক্ত হবে।
✅ ২য় উপায়ঃ হাত ও চোখের কো-অর্ডিনেশন উন্নত করাঃ
প্রথমটা থেকে এটা অনেক ভিন্ন। কিছু জিনিস বাচ্চারা এমনি করতে পারে কিন্তু অনেক জিনিস করতে গেলে হাত ও চোখ সমানতালে কাজ করাতে হয়। চোখের সেন্সগুলো ফাইন মোটর স্কিল নয়, কিন্তু ফাইন মোটর স্কিলের পারফরমেন্সে সরাসরি সাপোর্ট দেয়। এই ক্ষেত্রে প্রথমে কাটাকাটির কথা আসে। কোনো কিছু কাটতে গেলে আমাদের অবশ্যই দেখে কাটতে হয়। নাহলে দুটো জিনিস হয়। প্রথমটা দুর্ঘটনা এবং দ্বিতীয়টা হল যা করতে চাই সেটা হবে না। যদি কোনো জিনিসে সুতো দিয়ে আটকাতে চাই তাহলে হাত ও চোখের সমান ব্যবহার লাগবেই। কোনো কিছু আঁকতে গেলেও ভালো করে দেখতে হবে। বোতলের বা জারের ঢাকনা খোলা ও বন্ধ করতে গেলেও দুটো জিনিসের কো-অর্ডিনেশন লাগবে।
✅ ৩য় উপায়ঃ সৃজনশীলতা প্রকাশ করাঃ
সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যখন বাচ্চারা ফাইন মোটর স্কিল শেখার জন্য বিভিন্ন কাজ করবে বা কিছু তৈরী করবে, লক্ষ্য রাখা উচিত সে যাই করছে সেটা যেন ক্রিয়েটিভ কিছু হয়। ফলে ফাইন মোটর ও ক্রিয়েটিভিটি এই দুইটা দক্ষতা একসাথেই শেখা হয়ে যাবে। যেমন- বাচ্চা যখন কাগজ নিয়ে খেলবে তখন তাকে অরিগ্যামি (কাগজ ভাঁজ করে নানারকম জিনিস তৈরির জাপানী শৈলী) বানানো শেখান। বাচ্চাকে রঙ্গিন কাগজ, কাঁচি আর আঠা দিয়ে দিন। কাগজ কেটে বাচ্চা বিভিন্ন শেপ কেটে সেগুলো দিয়ে নিজের মনের মত শেপ তৈরি করল। করে সেগুলো একটা কাগজে আঠা দিয়ে লাগিয়ে ডিসপ্লে করে রাখল, একটা স্ক্র্যাপবুক বানিয়ে ফেলল। কাগজ কেটে বানাতে পারে পুতুল, হাঁস, হাতি, পেঁচা বা প্যারাস্যুট। দুই হাতের আঙ্গুলে রঙ নিয়ে কাগজে নিজের মনের মত৷ কোনো ছবি আঁকতে পারে। পাজল্ মেলাতে পারে। বিল্ডিং ব্লক দিয়ে কনস্ট্রাক্টিভ কিছু বানাতে পারে। আইস্ক্রিমের কাঠি দিয়ে বানাতে পারে প্লেন বা চেয়ার-টেবিল, বোতল দিয়ে পেন্সিল হোল্ডার, মোজা দিয়ে পাপেট এইরকম মজার মজার ও ক্রিয়েটিভ যত জিনিস।
এমন কাঠের খেলনাও শিশুর মোটরস্কিল বাড়াতে সাহায্য করে।
https://samuho.shop/product/weaving-string-beads/