18/03/2018
________মিস্ট্রিয়াস________
লেখক: ShoheL Rana
_________পর্ব-১__________
--আচ্ছা, আপনি বাংলোটা বিক্রি করতে চান কেন?" প্রশ্নটা করলাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকটাকে। লোকটার বয়স চল্লিশও হতে পারে, আবার পঞ্চাশও হতে পারে, চেহারা দেখে বয়স বুঝা দায়। ঘনঘন সিগারেট টানার অভ্যাস আছে তার। হাতের সিগারেটটায় একটান দিয়ে ধোয়া ছাড়লেন তিনি। আমি নাকে হাত চেপে ধরলাম। আমি আবার সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারিনা একদম। সিগারেটে কয়েক টান দিয়ে লোকটা আমার দিকে তাকালেন সরাসরি। মন্তব্য করলেন:
-আচ্ছা, চা খেতে খেতে কথা বলি আমরা?"
চা খাওয়া যায়? চা তো পান করার জিনিস। লোকটার ভুল সংশোধন করে দেয়ার ইচ্ছে ছিল। কষ্ট পাবে ভেবে সংশোধন করে দিলামনা।
--হুমমম, চলুন.... এই ঠান্ডায় এক কাপ চা হলে মন্দ না।" বলেই ভদ্রতা করে একটা হাসি দিলাম আমি।
লোকটার সাথে উনার বাসার ভেতরে গিয়ে বসলাম।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লোকটা জিজ্ঞেস করলেন: আপনার পরিচয়?"
--জি, আমার নাম রানা চৌধুরী। পেশায় কিছুনা। একজন শখের গোয়েন্দা। বাবার অগাধ টাকা আছে, আর আমি ইচ্ছে মতো নষ্ট করি। এডভেঞ্চার আর রহস্য ভালো লাগে। তাই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন পেয়ে আপনার বাংলোটা কিনতে এসেছি। এবার আপনার সম্পর্কে বলুন।"
লোকটা আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন: আমার নাম মাহতাব সিকদার। পেশায় একজন ফিল্ম ডিরেক্টর। বাংলোটাতে আমরা কেউ থাকিনা। ওটা শুধু শুধু পড়ে আছে তাই বিক্রি করতে চাই।"
--ও আচ্ছা, আপনাকে তাহলে টাকাটা ২ দিন পরে দিচ্ছি।
--আচ্ছা।
--এখন তাহলে আসি। আর দুইদিন পর আমি বাংলোটাতে উঠব।"
মাহতাব সিকদারের সাথে হ্যান্ডশেক করে চলে এলাম সেদিন।
২ দিন পর বাংলোটাতে উঠলাম আমি। সাথে মাহমুদ। মাহমুদ অনেকদিন ধরে আমার সাথে থাকে। বাবা-মা নেই তার। এতিম ছেলে। বয়স ১৭ বছর। প্রথমদিন তাকে ফুটপাতে শুয়ে থাকতে দেখে মায়া হয়েছিল আমার। কথা বলে বুঝলাম মেধাবী ছেলে। সেদিন থেকে আমার সাথে রেখে দিই তাকে। তারপর থেকে সবসময় আমার সাথেই থাকে সে।
মাহমুদ আর আমি মিলে বাংলোটা গুছালাম। বাহির থেকে তেমন সুন্দর না দেখালেও, ভেতরে অনেক সুন্দর বাংলোটা। এত সুন্দর একটা বাংলো এত সস্তা দামে দিয়ে দিলেন মাহতাব সিকদার। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল আমার কাছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কারণটা এখন আমাকে খুঁজে বের করতে হবে।
--মাহমুদ, রান্নাটা শেষ হয়ছে?" পেটে খিদে অনুভব করতেই মাহমুদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করলাম। সারাদিন কাজ করে খুব টায়ার্ড হয়ে গেছি।
--হ্যা ভাইয়া হচ্ছে। আর একটু ওয়েট করেন।"
বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ পরিষ্কার করতে করতে মাহমুদের রান্না শেষ হয়েছে। তারপর দুইজন একসাথে বসে খাওয়া শুরু করলাম। খেতে খেতে হঠাৎ মাহমুদের চোখ গেল জানালার ওপাশে।
--ভাইয়া ওখানে কে?" চিৎকার করে উঠল মাহমুদ।
তড়িৎবেগে ঘুরে তাকালাম আমি। বাইরে চাঁদের আলোতে কাউকে দেখতে পেলামনা আমি। তবে কারো হাটার শব্দ শুনলাম। খাওয়াটা অর্ধেক রেখে, হাত ধুয়ে তাড়াতাড়ি বের হলাম আমি। অনেক্ষণ খুঁজে কাউকে পেলামনা। বাংলোর পেছনে কিছু ভাঙ্গা হাতের চুড়ি খুঁজে পেলাম। মাহমুদ এসে পাশে দাঁড়াল আমার।
--কে এসেছিল ভাইয়া?" মাহমুদ জিজ্ঞেস করল।
মোবাইলের টর্চ লাইটটা জ্বেলে ভাঙ্গা চুড়ির উপর আলো ফেললাম আমি।
--একটা মেয়ে....।" ভাঙ্গা চুড়িগুলো মাটিতে থেকে তুলতে তুলতে বললাম আমি।
--মেয়ে?" মাহমুদ অবাক হল।
--হ্যা মেয়ে।
--কিন্তু এতরাতে এখানে মেয়ে আসবে কোত্থেকে? কাছাকাছি তো কোন ঘর নেই। তাও আবার এই টিলার উপর মেয়ে আসবে কেন এত রাতে?" মাহমুদের চোখে বিস্ময়।
--বুঝতেছিনা এখনও, মেয়েটা এদিক দিয়ে পালিয়েছে। পালানোর সময় হয়তো এই জায়গায় এসে হোচট খেয়ে পড়ে গেছিল?"
--পড়ে গেছিল? কিভাবে বুঝলেন?"
মাটিতে আবারও আলো ফেললাম আমি। তারপর বললাম: দেখ, দুইটা হাতের ছাপ লেগে আছে মাটিতে।
--কিন্তু এই ছাপ তো আগেরও হতে পারে?"
--হ্যা, আগের হতে পারত, কিন্তু আগের না। এই বাংলোতে অনেকদিন ধরে কেউ থাকেনা। আগের ছাপ হলে এতদিনে মুছে যেত। আর এই ছাপটা কেউ পালাতে গিয়ে অসতর্ক হয়ে পড়ে যাওয়ার জন্য হয়ছে। আর দেখ, হাতের আঙুলগুলো তার লম্বা লম্বা।
--হুমমম বুঝলাম, কিন্তু কে আসছিল এখানে? আর এভাবে পালিয়ে গেল কেন?"
--খুব শীঘ্রই জানতে পারব। যে এসেছিল, সে নিশ্চয়ই আবার আসবে। চল, এখন ঘুমাব।"
--হুমমম.... চলেন।"
দুজনে বাংলোর ভেতরে আসলাম। ভেতরের রুমটাতে আমি থাকলাম, আর সামনের রুমে মাহমুদ। খুব ক্লান্ত আমি, তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথে ঘুম চলে এল আমার। কিন্তু শান্তিতে বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না। হঠাৎ ধড়পড় করে উঠে পড়লাম ঘুম থেকে। দরজায় ধাক্কা দিয়ে মাহমুদ "ভাইয়া ভাইয়া" বলে চিৎকার করতেছিল। দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলাম তাকে: কি হয়েছে মাহমুদ?"
--ভাইয়া, অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম আমি। কেউ আমাদেরকে এখান থেকে চলে যেতে বলছে।"
মাহমুদের কথা শেষ হতে না হতেই আবার শুরু হল। কেউ যেন ভয়ংকর কণ্ঠে বলছে: ওরে মূর্খের দল, চলে যা, চলে যা এখান থেকে। নিজের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে চলে যা।" তারপর থেমে গেল কণ্ঠটা।
--মাহমুদ, চল বাইরে গিয়ে দেখে আসি।" কথাটি বলে বিছানা থেকে নামলাম।
মাহমুদ ভয় পেয়ে বলল: কিন্তু ভূত/টূত কিছু না তো?"
--আরে কি বলিস? আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা। যাবি আমার সাথে?"
মাহমুদকে কাঁপতে দেখে বললাম: ঠিক আছে তুই এখানে থাক, আমি একাই দেখে আসি।"
--না ভাইয়া চলুন। আমিও যাচ্ছি সাথে।"
তারপর দুজনে বের হলাম আমরা। যেদিক থেকে শব্দটা এসেছিল সেদিকে গেলাম দুজন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলামনা।
--কি হচ্ছে ভাইয়া এসব?" মাহমুদের কণ্ঠে ভীতি ফুটে উঠল।
--বুঝতেছিনা এখনও। কেউ হয়তো চাই আমরা এখানে যেন না থাকি।
--কিন্তু, ওটা তো কোন মানুষের কণ্ঠ বলে মনে হলনা।"
--মাথা থেকে বাদ দে ওসব। চল, ঘুমাবি.....
তারপর রুমে এসে শুয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙল মাহমুদের ডাকে। চোখ খুলে তাকালাম ওর দিকে।
--কি হয়েছে?" জিজ্ঞেস করলাম।
--ভাইয়া, একটা মেয়ে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।"
--মেয়ে!!! কোন মেয়ে??
--চিনিনা। আপনি দেখেন।
--ঠিক আছে, তুই ওকে বসতে বল। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
--আচ্ছা...."
দাঁত ব্রাশ করে ফ্রেশ হতে হতে ১০ মিনিট লেগে গেল। তারপর সামনের রুমে গিয়ে দেখলাম একটা তরুণী মেয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে মেয়েটি একটু নড়েচড়ে বসল। একটা চাদর জড়ানো তার গায়ে।
দেখতে যথেষ্ট রূপবতী মেয়েটা। চেহারায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ ফুটে উঠেছে তার। মেয়েটার মনে হয় ঠান্ডা লাগতেছে, হাতদুটো চাদরের ভেতর বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়েছে।
--আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলামনা।" মেয়েটার সামনের সোফায় বসতে বসতে বললাম।
মেয়েটা ইতস্তত করে বলল: আমার নাম শিখা। এখানকার স্থানীয় আমি।
--হুমমম, কোন দরকারে কি এসেছেন আমার কাছে?
--হ্যা, একটা কথা বলার জন্য এসেছি।
--আচ্ছা, আমরা চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথা বলি।" তারপর মাহমুদের উদ্দেশ্যে আওয়াজটা বাড়িয়ে বললাম: মাহমুদ, দুই কাপ চা দিয়ে যা এখানে....."
একটুপর মাহমুদ চা নিয়ে এল। একটা কাপ শিখার দিকে বাড়িয়ে দিলাম আমি। তারপর বললাম: হ্যা, এইবার বলুন.....
শিখা চাদরের ভেতর থেকে হাত বের করে চায়ের কাপটা নিল। চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে শিখা বলল: কেন এসেছেন আপনি এখানে?"
--কেন এসেছি মানে?" অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
--এখান থেকে চলে যান, এটা খারাপ জায়গা। এখানে আগে যারা থাকত, তারা কেউ বেশিদিন থাকতে পারতনা। সবার কিছু না কিছু অঘটন ঘটেছে। তাই বলছি সময় থাকতে চলে যান।"
--আপনি কি আমাকে সাবধান করতে এসেছেন এত সকাল সকাল?
--দেখুন, কাউকে সাবধান করাটা আমার কর্তব্য। আপনাকে সাবধান করেছি, এখন আমি আসি।" বলেই হাতের খালি কাপটা ট্রেতে রাখল শিখা। তারপর উঠে দাঁড়াল। দরজা থেকে বের হল সে। পিছন থেকে আমি ডাক দিলাম: মিস শিখা, একটু দাঁড়ান।"
শিখা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ঘুরে তাকাল আমার দিকে।
--জি বলুন?" আগ্রহ দেখাল সে।
--আপনার ভাঙা চুড়িগুলো নিয়ে যাবেননা?" প্রশ্ন করলাম আমি।
--মানে?" অবাক হল শিখা।
গতরাতে কুড়িয়ে পাওয়া ভাঙা চুড়িগুলো এগিয়ে দিলাম তার দিকে। তারপর বললাম: মনে হয় আপনার চুড়ি, নিয়ে যান।
--এগুলো আমার চুড়ি না।"
--কিন্তু চুড়িগুলো তো বলতেছে এরা এতদিন আপনার হাতে বসবাস করেছিল।
--কি যা তা বলতেছেন? চুড়ি কি করে কথা বলবে?" বলার সময় শিখার গলা কেঁপে উঠল লক্ষ্য করলাম।
--চুড়ি কথা বলেনা, কিন্তু এটা সত্যি যে এগুলো আপনার। আপনার হাতটা চাদর থেকে বের করুন তো, আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে আপনার হাতে একটা কাটা দাগ থাকবে।"
শিখা চাদর থেকে তার বাম হাতটা বের করল, ওখানে কোন কাটা দাগ নেই।
--এবার ডান হাতটা বের করুন।" বললাম আমি।
শিখা ভয়ে ভয়ে বের করল ডান হাতটা। একটা কাটা দাগ সত্যি সত্যি আছে ওখানে।
--বিশ্বাস করুন, ওগুলো আমার চুড়ি না।" শিখা বলল।
--দেখুন, মিথ্যে বলবেননা। আমি জানি এগুলো আপনার চুড়ি। এই কাচের চুড়িটা দেখুন, এখানে একটুখানি রক্ত লেগে আছে। যা আপনার হাতের ঐ ক্ষতস্থানের রক্ত।
--আপনি কি করে এতটা শিওর হলেন যে, ওটা আমার হাতের রক্ত?"
--প্রমাণ করার জন্য কি এখন ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্লাড টেস্ট করব?"
--আচ্ছা থাক, করতে হবেনা। আমি মানলাম ওটা আমার রক্ত। আর চুড়িগুলো আমার।
--আপনি গতরাতে এখানে এসেছিলেন কেন?"
শিখা থতমত খেয়ে বলল: আসলে, আমি গতরাতেও এসেছিলাম আপনাকে সাবধান করার জন্য।" কিন্তু হঠাৎ ভয় পেয়ে গেছিলাম। রাতের বেলায়, অপরিচিত দুইটা লোক, আর একা একটা মেয়ে আমি। বুঝতেই তো পারছেন। তাই পালাতে হয়েছিল। কিন্তু পালাতে গিয়ে একটা ইটে হোচট খেয়ে পড়ি। কিন্তু আপনি কি করে বুঝলেন ওটা আমি?" শিখার চোখে বিস্ময়।
আমি একটা রহস্যের হাসি দিলাম তখন।
(চলবে......)
(প্রথম পর্বে প্রচুর সাড়া না পেলে গল্পটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবনা....)