19/11/2020
৫০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট যার আছে তার কি আর চিন্তা আছে? থাকার কথাও নয়। তবে সেটি যদি হয় জিম্বাবুয়ের, তখন একটু চিন্তা হতেই পারে। কারণ জিম্বাবুয়েতে নাকি হাজার ট্রিলিয়ন টাকার নোটও আছে। আর আমাদের টাকার মানের কাছে সেই হাজার ট্রিলিয়ন টাকার নোটও কিছু নয়। আজ থাকছে এক
কায়ছারের টাকার খনির গল্প।
সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকলেও চিন্তা-ভাবনার পৃথিবীতে অনেকটাই জুড়ে আছে সংগ্রহ তার। তিনি মূলত টাকা ও মুদ্রার সংগ্রাহক। বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রচলিত ও অপ্রচলিত কাগজি এবং ধাতব মুদ্রা রয়েছে আহমেদ কায়সারের সংগ্রহে।
বলতে গেলে না বুঝেই প্রথমদিকে টাকা সংগ্রহ করতেন। দেশি টাকার পুরনো এবং আধা ছেঁড়া একটি নোট থেকে আজ এত বড় সংগ্রহশালা। এখন এটি শখ থেকে নেশায় পরিণত হয়েছে। শুরুর দিকে সার্কভুক্ত দেশের মুদ্রা ও নোট সংগ্রহ করতেন। এরপর গোটা দুনিয়ার নোট ও মুদ্রা সংগ্রহের দিকে হাত বাড়ান। যেসব দেশ এর মধ্যে পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেছে, আছে সেসব দেশের দুর্লভ কাগজি নোট এবং মুদ্রা।
শুরুর গল্প
স্কুলজীবন থেকেই তার সংগ্রহ শুরু। টাকা ও ডাকটিকিট তখন একসঙ্গেই সংগ্রহ করতেন। পরে ডাকটিকিট সংগ্রহ কমিয়ে টাকা সংগ্রহের দিকে ঝোঁকেন কায়সার। বর্তমানে তার সংগ্রহের ঝুলিতে একে একে জমা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন বিলুপ্ত দেশ এবং বর্তমান দেশগুলোর কাগজি ও ধাতব মুদ্রা। আছে এক টাকার কাগজি মুদ্রা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার ট্রিলিয়ন মূল্যমানের কাগজি নোট।
প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালের প্রচলিত মুদ্রাও আছে তার সংগ্রহে। আছে ভারতবর্ষের রাজা এবং সুলতানি আমলের ধাতব মুদ্রা, স্বর্ণ, রৌপ্য, তামাসহ বিভিন্ন ধরনের ধাতুর নানা দেশের প্রচলিত এবং অপ্রচলিত ধাতব মুদ্রা। আছে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ৬টি টেরিটরির আলাদা আলাদা ধাতব মুদ্রা, মুদ্রা স্মারক, প্রুফ (হাতের স্পর্শহীন) মুদ্রা। এমন কিছু কাগজি নোটও আছে যে নোটের ছবি একই কিন্তু প্রিফিক্স (কাগজি মুদ্রার গায়ে লিখিত বর্ণমালা) আলাদা। এই পার্থক্য থেকেই চেনা যায় আলাদা আলাদা দেশগুলোকে।
বাংলাদেশের মুদ্রা ও নোট
বাংলাদেশের টাকার যে সংগ্রহ তার কাছে আছে সে সংগ্রহ খুব কম মানুষের কাছেই আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ ভারতের সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস (নাসিক) স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক টাকা, পাঁচ টাকা, ১০ টাকা এবং ১০০ টাকার কাগজি মুদ্রা ইস্যু করে। এক টাকার নোটে স্বাক্ষর করেন অর্থ সচিব কেএ জামান এবং পাঁচ টাকা, ১০ টাকা এবং ১০০ টাকার নোটে স্বাক্ষর করেন গভর্নর এ এম হামিদুল্লাহ। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১০ জন গভর্নরের স্বাক্ষরকৃত বিভিন্ন নকশা এবং আকৃতির বিভিন্ন মূল্যমানের কাগজি মুদ্রা ইস্যু করে। আর কায়ছারের সংগ্রহে আছে তার প্রায় সবগুলোই। এ ছাড়াও এক পয়সা থেকে শুরু করে পাঁচ টাকা পর্যন্ত সব নকশা ও আকৃতির ধাতব মুদ্রাও তার সংগ্রহে আছে।
ভিনদেশের মুদ্রা ও নোট
এ পর্যন্ত তার সংগ্রহে আছে ২৪৫ দেশের কাগজি মুদ্রা এবং ২৭৬ দেশের ধাতব মুদ্রা। আর এ সংগ্রহের তালিকায় আছে বিশ্বের বেশকিছু দুর্লভ দেশের মুদ্রা। যেমন ধাতব মুদ্রার মধ্যে_ অ্যাসেনশেন আইল্যান্ড, জাঞ্জিবার, কাতাংগা, বেলজিয়ান কঙ্গো, তিব্বত, রোভেশিয়া, প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড আইল্যান্ড, ওয়েলস অ্যান্ড ফুটুনা, কিউরেকাউ, আলডারনিসহ বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, ফ্রেঞ্চ অধিকৃত প্রায় সব কলোনির ধাতব মুদ্রা। তেমনি কাগজি মুদ্রার মধ্যে আছে আরুবা, অস্ট্রো-হাঙ্গেরি, বহেমিয়া অ্যান্ড মোরাভিয়া, ফারো আইল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, স্ট্রেইটস সেটেলমেন্ট, ইস্ট আফ্রিকা, মালি, মন্টেনিগ্রো, লিচেস্টিনস্টেইনসহ বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, ফ্রেঞ্চ অধিকৃত প্রায় সব কলোনি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপান দখলকৃত বিভিন্ন দেশের মুদ্রা। এ ছাড়া বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশের কাগজি এবং ধাতব মুদ্রাও তার সংগ্রহে আছে।
অভিযানের এদিক-ওদিক
মুদ্রা সংগ্রহের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কায়সার জানান, মুদ্রা সংগ্রহ একটি ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য বিষয়। প্রায় সময় বন্ধু মহলে এ নিয়ে হাস্যরস হয়। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক ফকির ডেকেও বিদ্রূপ করেন তাকে। আবার বলেন, এয়ারপোর্টে থালা নিয়ে বসে থাকতে। এতে আরও কিছু সংগ্রহ হবে। সংগ্রহ করতে গিয়ে মজার সব ঘটনার পাশাপাশি দুঃখের স্মৃতিও কম নেই তার। একসঙ্গে একবার তার ২০টি দুর্লভ মুদ্রা চুরি হয়ে যায়। এ ছাড়া শুরুর দিকে মানুষের ধোঁকাতেও পড়তেন প্রায়ই। একবার বাংলাদেশের দুই টাকার দোয়েল পাখির ছবিসংবলিত নোট বিশ্বের সুন্দর নোটগুলোর মধ্যে পুরস্কৃত হয়, যা জানা ছিল না। সে সময় এক পর্তুগিজ বন্ধু আমাকে সেই নোটটি পাঠাতে বলেন। কিন্তু তার পরিবর্তে সে কী পাঠাবে জানতে চাইলে জানান, সেই টাকার বিনিময়ে তাকে তাদের দেশের পাঁচ ইউরো মূল্যমানের নোটসহ (১ ইউরো = ৮৪ টাকা প্রায়) আরও বেশকিছু উপহার দেবেন। পরে তাই হয়েছিল। বাংলাদেশের দুই টাকার পরিবর্তে নানা উপহার পাঠিয়েছিলেন। সংগ্রহ করতে গিয়ে তার সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রাহকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। এর মধ্যে নরওয়ের একজন সঙ্গীত শিল্পী তাকে বিভিন্ন দেশের কাগজি নোট ও ধাতব মুদ্রা দিয়ে সাহায্য করেন।
বাংলাদেশি কাগজি মুদ্রা সংগ্রহে বন্ধু মহলের মধ্যে বাংলাদেশ নিউম্যাসমেটিক কালেক্টর সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুল হক তাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন। এ ছাড়া স্কুলজীবনের বন্ধু সাইফুল হক রনি লন্ডন থেকে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও কাগজি নোট সংগ্রহে সহযোগিতা করেন। যারা নতুন সংগ্রাহক তাদের উদ্দেশে কায়সার বলেন, যেহেতু মুদ্রা সংগ্রহ একটি ব্যয়বহুল শখ, তাই মুদ্রা সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করে মুদ্রা কেনা এবং বিনিময় করা উচিত। আর আমার একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। আমি বিভিন্ন দেশের কাগজি নোট এবং মুদ্রার একটি মিনি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে দর্শনার্থীরা একসঙ্গে বিশ্বের সব দেশের কাগজি নোট ও ধাতব মুদ্রা দেখতে পাবেন।