15/02/2021
জীবনানন্দ দাসের ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ার পর মীর আব্দুস শুকুর ভাবলেন, 'আরে! এমন কবিতা তো আমিও লিখতে পারি'। যেই কথা, সেই কাজ। একটা কবিতা লিখে ফেললেন। জীবনের প্রথম কবিতাটি পড়তে দিলেন চাচাতো বোন হানুকে।
হানু কবিতাটি পড়ে বললো, “এই কবিতা তো আগে কোথাও পড়েছি!”
বোনের মন্তব্য শুনে তরুণ কবি হাসবেন নাকি কাঁদবেন? তাঁর লেখা কবিতাকে বোন বলছে ‘আগে পড়েছি’। যেন তিনি এটা কপি করেছেন। আবার এটাও তো ভাবতে পারেন, আমি আসলেই তো কবিতা লিখতে পারি।
মোল্লা বাড়িতে জন্ম নেয়া একটা ছেলে বললো- ‘আমি কবি হতে চাই’। তরুণ বয়সের এই আবেগকে রুখে দেবার জন্য হানু বাধা দিলেন। বললেন, “কবিতা লিখলে ভাত জুটবে কোত্থেকে?”
জীবন সাগরে সাঁতার কাটতে গিয়ে চাচতো বোনের কথাটি বারবার তাঁর মনে পড়ে। তল্পিতল্পাহীন অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসেন কবি হবার জন্য।
ঢাকায় এসে জীবিকার সন্ধান করে ঢাকাকেই আপন করে নেন। ঢাকা আর নিজের জন্মস্থানের তুলনা করে বলেন- “যে শহর জন্ম দেয় কিন্তু জীবিকা দেয় না তারচেয়ে যে শহর জীবিকা দেয় তাকে আমার কাছে মাতৃতুল্য মনে হয়।”
সেদিন চাচাতো বোন তাকে ‘কবি’ বলে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু, তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন ছিলেন তাঁর চাচী, সেই চাচী তাকে ‘কবি’ বলে ডাকতেন। গ্রামের মানুষরাও তাঁকে ‘কবি’ বলে ডাকতো। অথচ তখনো তাঁর কোনো কবিতা প্রকাশিত হয়নি!
মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করা আল মাহমুদকে একসময় মানুষ ‘বিশ্বাসীদের কবি’ সম্বোধন করে। অথচ জীবনের প্রথমদিকে নিজের বিশ্বাস নিয়ে দোদুল্যমান ছিলেন এই কবি। তাঁর মা বাবাকে অভিযোগ করতেন, “তোমার ছেলে তো বইটই পড়ে নাস্তিক হয়ে গেছে।” বাবা মায়ের কথা কানে নিতেন না। তিনি ভাবতেন, এই ছেলে বিভ্রান্ত হতে পারে। সে অবশ্যই ফিরে আসবে।
আল মাহমুদ জীবনের মধ্যখানে ফিরেও আসেন। ১৯৭৮ সালে হজ্বে যান। হজ্ব করে আসার পর প্রগতিবাদী কবিরা তাঁকে ‘মৌলবাদী’ বলে আখ্যা দেয়। তাদের মৌলবাদী আখ্যাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কবি লিখলেন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কাব্যগ্রন্থটি।
এতোদিন তাঁর যতো বন্ধু-শুভাকাঙ্খী জুটেছিলো, এই কাব্যগ্রন্থ লেখার পর সবাই তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়। এই কাব্যগ্রন্থ তাঁকে আবার নতুন করে ‘মৌলবাদী’ প্রমাণ করিয়ে দেয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তাঁর লেখা প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। যারা সারাদিন বাক-স্বাধীনতার কথা বলে চায়ের কাপ গরম করতো, সেইসব প্রগতিবাদীদের এমন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দেখে কবি বেশ মজা পান।