03/20/2024
ফজরের আজান শুরু হয়েছে, এমতাবস্থায় আপনার হাতে সেহরির খাবার; এখন কী করবেন ?
নিশ্চয় রোজার নিয়তকারী ব্যক্তির পানাহারের প্রান্তসীমা তখন উপনীত হয়, যখন মুয়াজ্জিন ফজর উদয়ের আজান আরম্ভ করে। যে ব্যক্তি রোজার নিয়ত করেছে, সে যখন মুয়াজ্জিনের উক্ত আজান শোনে, তখন পানাহার থেকে বিরত হওয়া এবং মুখগহ্বরে স্থিত আহার্য ও পানীয় মুখ থেকে ফেলে দেওয়া তার জন্য আবশ্যক (ওয়াজিব)। নচেৎ তার রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। এটা চার মাযহাবের ‘উলামা এবং যাহিরী ও অন্যান্য বিদ্বানদের অধিকাংশের অভিমত।
এমনকি দুই ফাক্বীহ—ইবনু বাত্বত্বাল আল-মালিকী তদীয় ‘শারহু সাহীহিল বুখারী’ গ্রন্থে (খ. ২; পৃ. ২৪৯) এবং আন-নাওয়াউয়ী আশ-শাফি‘ঈ স্বীয় “আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব” গ্রন্থে (খ. ৬; পৃ. ৩৩৩) উল্লেখ করেছেন, তদনুরূপ আরও কতিপয় ফাক্বীহ উল্লেখ করেছেন, এ বিষয়ে ‘উলামাদের মধ্যে কোনো মতদ্বৈধতা নেই যে, ফজর উদিত হয়ে গেলে পানাহাররত ব্যক্তিকে মুখের মধ্যকার খাবার বা পানীয় ফেলে দিতে হবে।
ইমাম ইবনু ক্বাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘তাহযীবু সুনানি আবী দাঊদ’ গ্রন্থে (খ. ৬; পৃ. ৩৪১; হা/২৩৪৭ – এর সংশ্লিষ্ট আলোচনা; টীকায় ‘আওনুল মা‘বূদের টেক্সট-সহ) বলেছেন, وذهب الجمهور إلى امتناع السحور بطلوع الفجر، وهو قول الأئمة الأربعة، وعامة فقهاء الأمصار، ورُوي معناه عن عمر، وابن عباس “অধিকাংশ বিদ্বান এই অভিমত পোষণ করেছেন যে, ফজর উদিত হয়ে গেলে সেহরি করা নিষিদ্ধ। এটি চার ইমামের অভিমত এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ফাক্বীহবৃন্দের অধিকাংশের অভিমত। এই মর্মের কথা বর্ণিত হয়েছে ‘উমার ও ইবনু ‘আব্বাস থেকে।”
·
এক. আমি বলছি, এটা একারণে যে, নাবী ﷺ থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ﷺ বলেছেন, فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى تَسْمَعُوا أَذَانَ ابْنِ أُمِّ مَكْتُومٍ “ইবনে উম্মে মাকতুমের আজান না শোনা পর্যন্ত তোমরা পানাহার করো।” [সাহীহ বুখারী, হা/২৬৫৬, ৬২২, ৬১৭, ১৯১৮; সাহীহ মুসলিম, হা/১০৯২; ‘আইশাহ ও ইবনু ‘উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) বর্ণিত হাদীস থেকে]
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তদীয় “শারহুল ‘উমদাহ” গ্রন্থে (খ. ১; পৃ. ৫২৬; রোজা অধ্যায়; হা/৫৫৭ – এর পার্শ্ববর্তী আলোচনা) উদ্ধৃত হাদীস থেকে দলিল গ্রহণের পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,
فقد أجاز صلى الله عليه وسلم الأكل إلى حين يُؤذِّن ابن أمِّ مَكتوم، مع قوله: إنَّهُ لا يُؤَذِنُ حتَّى يَطْلُعَ الفَجْر. ومعلومٌ أنَّ مَن أكل حين تأذينه، فقد أكل بعد طلوع الفجر، لأنَّه لابُدَّ أنْ يتأخَّر تأذينه عن طلوع الفجر، ولو لحظة
“ইবনে উম্মে মাকতুমের আজানের শুরু অবধি পানাহার করাকে নাবী ﷺ বৈধ করেছেন। সেই সাথে তিনি বলে দিয়েছেন, কেননা সে ফজর উদয় না হওয়ার আগে আজান দেয় না। এ থেকে বিদিত হয় যে, আজানের সময় যে ব্যক্তি আহার করে, সে মূলত ফজর উদিত হওয়ার পরই আহার করে। কেননা তাঁর আজান ফজর উদিত হওয়ার পরেই আরম্ভ হয়, যদিও উদয়কাল ও আজান আরম্ভের মধ্যকার ক্ষণটি সামান্য হয়ে থাকে।”
·
দুই. উক্ত আলোচনাকে জোরদার করে নিম্নে বর্ণিত এই হাদীস। নাবী ﷺ বলেছেন, لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدًا مِنْكُمْ أَذَانُ بِلَالٍ مِنْ سُحُورِهِ فَإِنَّهُ يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ لِيَرْجِعَ قَائِمَكُمْ، وَيُوقِظَ نَائِمَكُمْ “বিলালের আজান যেন তোমাদেরকে সেহরি খাওয়া থেকে বাধা না দেয়। কেননা সে রাত অবশিষ্ট থাকতেই আজান দেয়, যাতে করে তোমাদের মধ্যে যারা ক্বিয়ামকারী তারা গৃহে ফিরে যায়, আর ঘুমন্ত ব্যক্তিরা জাগ্রত হয়।” [সাহীহ বুখারী, হা/৬২১, ৫২৯৮, ৭২৪৭; সাহীহ মুসলিম, হা/১০৯৩; ইবনু মাস‘ঊদ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণিত হাদীস থেকে]
এই হাদীস প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি রোজার নিয়ত করেছে, সে আজান শুরু হলে পানাহার থেকে বিরত হবে। তবে বিলালের আজান শুরু হলে তা করবে না। কেবল সেই আজানের ক্ষেত্রেই তা করবে, যেই আজান সুবহে সাদিকের সময় প্রথম আজানের পরে দেওয়া হয়।
·
তিন. এতদ্ব্যতীত আলোচ্য বক্তব্যের প্রমাণ হলো স্বয়ং মহান আল্লাহর বাণী। মহান আল্লাহ সূরাহ বাক্বারাহয় উদ্ধৃত রোজার আয়াতসমূহে বলেছেন, وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ “ফজরের কালো রেখা থেকে সাদা রেখা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করো; অতঃপর রাতের আগমন অবধি রোজাকে সম্পূর্ণ করো।” [সূরাহ বাক্বারাহ: ১৮৭]
‘পর্যন্ত (حَتَّى)’ একটি অব্যয়, যা সময়ের প্রান্তসীমা শেষ হয়ে যাওয়ার অর্থ জ্ঞাপন করে। ফলে এই আয়াত প্রমাণ করছে, ফজর উদিত হওয়ার সময় থেকেই পানাহার থেকে বিরত থাকার ক্ষণ শুরু হয়। উল্লিখিত দলিলগুলোর সুস্পষ্ট মর্মার্থ ওই ব্যক্তিকে শামিল করে, যার হাতে কিংবা সম্মুখে আজানের সময় খাদ্য ও পানীয় থাকে। আবার তা ওই ব্যক্তিকেও শামিল করে, যার সম্মুখে আজানের সময় আহার্য থাকে না।
·
❏ ভিন্ন মতাবলম্বীদের দলিলের পর্যালোচনা:
পক্ষান্তরে একটি হাদীস রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, إِذَا سَمِعَ أَحَدُكُمُ النِّدَاءَ وَالإِنَاءُ عَلَى يَدِهِ فَلاَ يَضَعْهُ حَتَّى يَقْضِىَ حَاجَتَهُ مِنْهُ “তোমাদের কেউ যখন আজান শোনে, এমতাবস্থায় তার হাতে রয়েছে পানপাত্র, তখন সে যেন ওই পাত্র থেকে নিজের প্রয়োজন সম্পূর্ণ না করার আগে তা রেখে না দেয়।”
এই হাদীস দুই দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ। যথা:
এক. সনদের দিক থেকে। কেননা হাম্মাদ বিন সালামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক হাদীসটির মাওকূফ, মারফূ‘, মুরসাল ও মাক্বতূ‘ বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন রাওহ ইবনু ‘উবাদাহ, ‘আব্দুল আ‘লা বিন হাম্মাদ, ‘আফফান, গাসসান, ‘আব্দুল ওয়াহিদ বিন গিয়াস, ‘উবাইদুল্লাহ ও ‘আব্বাস। তাঁরা সকলেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন সালামাহ থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন ‘আমর আল-লাইসী থেকে, তিনি আবূ সালামাহ থেকে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন। এরপর তিনি হাদীসটি উল্লেখ করেছেন মারফূ‘ সূত্রে।
আর মুহাম্মাদ বিন ‘আমরও মতানৈক্যপূর্ণ রাবি (مُختَلَفٌ فيه)। হাদীসটি গ্রন্থাবদ্ধ করেছেন ইমাম আহমাদ (হা/৯৪৭৪, ১০৬২৯), আবূ দাঊদ (হা/২৩৫২), ইবনু জারীর তদীয় তাফসীর গ্রন্থে (হা/৩০১৫) এবং হাকিম (হা/৭২৯, ৭৪০ ও ১৫৫২)। এছাড়াও হাদীসটি রয়েছে নিম্নোক্ত গ্রন্থদ্বয়ে—মাজমূ‘ ফীহি মুসান্নাফাত আবিল হাসান ইবনিল হুমামী ওয়া আজযাউন হাদীসিয়্যাতুন উখরা (৫৪-৫৮৫), আল-ফাওয়াইদুল মুনতাক্বাতু মিনাল জুযইল আওয়্যালি মিন হাদীসি ইবনি আবী সাবির (হা/২)।
তদনুরূপ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন রাওহ ইবনু ‘উবাদাহ, হাম্মাদ বিন সালামাহ থেকে, তিনি ‘আম্মার বিন আবূ ‘আম্মার থেকে, তিনি আবূ হুরাইরাহ থেকে, তিনি নাবী ﷺ থেকে। অর্থাৎ, হাদীসটি মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি গ্রন্থাবদ্ধ করেছেন আহমাদ (হা/১০৬৩০), ইবনু জারীর তদীয় তাফসীরে (হা/৩০১৬) এবং হাকিম (হা/৭৪০)।
অনুরূপভাবে হাম্মাদ বিন সালামাহ মাওকূফ সূত্রে আবূ হুরাইরাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ফলে ইমাম আবূ হাতিম আর-রাযী (রাহিমাহুল্লাহ) কে যখন তাঁর পুত্র হাফিয ‘আব্দুর রহমান যখন প্রশ্ন করেন, তখন তিনি এ মর্মে বর্ণিত মারফূ‘ সূত্রের হাদীসকে দুর্বল আখ্যা দেওয়ার পর বলেছেন, أمَّا حديث عمَّار: فعن أبي هريرة موقوف “পক্ষান্তরে ‘আম্মারের হাদীস আবূ হুরাইরাহ থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।” [কিতাবুল ‘ইলাল, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৩৫-২৩৬; প্রশ্ন নং: ৩৪০; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৩৭-১৩৮; প্রশ্ন নং: ৭৫৯]
·
ইবনু হাযম আয-যাহিরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “হাম্মাদ বিন সালামাহর সনদে বর্ণিত হয়েছে, আমাদের কাছে হুমাইদ হাদীস বর্ণনা করেছেন, আবূ রাফি‘ ও অন্যদের থেকে, তাঁরা আবূ হুরাইরাহ থেকে। একদা তিনি আজান শুনলেন, এমতাবস্থায় তাঁর হাতে রয়েছে পানপাত্র, তখন তিনি বললেন, কাবার রবের কসম, আমি এই বিধান সংরক্ষণ করেছি (أَنَّهُ سَمِعَ النِّدَاءَ وَالْإِنَاءُ عَلَى يَدِهِ فَقَالَ: أَحْرَزْتُهَا وَرَبِّ الْكَعْبَةِ)।
হাদীসটি হাম্মাদ বিন সালামাহ বর্ণনা করেছেন, ইউনুস থেকে, তিনি হাসান থেকে, তিনি নাবী ﷺ থেকে। অর্থাৎ হাদীসটি মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি গ্রন্থাবদ্ধ করেছেন আহমাদ (হা/৯৪৭৪) এবং বাইহাক্বী তদীয় ‘খিলাফিয়্যাত’ গ্রন্থে (খ. ২; পৃ. ৪৮; সংখ্যা: ১১২০)।
তদনুরূপ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ‘আব্দুল আ‘লা, হাম্মাদ বিন সালামাহ থেকে, তিনি হিশাম থেকে, তিনি স্বীয় পিতা থেকে, তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলতেন, إذا سمعَ أحدُكم النِّداءَ والإناءُ على يَديهِ فلا يضعْه حتى يَقضيَ حاجتَه مِنه، وكانَ يأمرُ بَنيهِ بِه ‘তোমাদের কেউ যখন আজান শোনে, এমতাবস্থায় তার হাতে রয়েছে পানপাত্র, তখন সে যেন ওই পাত্র থেকে নিজের প্রয়োজন সম্পূর্ণ না করার আগে তা রেখে না দেয়।’ তিনি তাঁর সন্তানসন্ততিকে এ কাজের আদেশ দিতেন। এই হাদীসটি মাক্বতূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি গ্রন্থাবদ্ধ হয়েছে এই গ্রন্থে—মাজমূ‘ ফীহি মুসান্নাফাত আবিল হাসান ইবনিল হুমামী ওয়া আজযাউন হাদীসিয়্যাতুন উখরা (২৬-৫৭৭)।
হাদীসটিকে দুর্বল (দ্ব‘ঈফ) বলেছেন মহামতি মুহাদ্দিস ইমাম আবূ হাতিম আর-রাযী (রাহিমাহুল্লাহ)। যেমনটি রয়েছে তাঁর পুত্র হাফিয ‘আব্দুর রহমান বিরচিত “কিতাবুল ‘ইলাল” গ্রন্থে (খ. ২; পৃ. ২৩৫-২৩৬; প্রশ্ন নং: ৩৪০; খ. ৩; পৃ. ১৩৭-১৩৮; প্রশ্ন নং: ৭৫৯)। আবূ হাতিম আর-রাযী হলেন পূর্ববর্তী যুগের আইম্মাতুল হাদীস এবং জারাহ, তা‘দীল ও ‘ইলালের বয়োজ্যেষ্ঠ ইমামদের অন্যতম।
তাঁর পুত্র ‘আব্দুর রাহমান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আমি আমার পিতাকে একটি হাদীস প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম। যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন রাওহ ইবনু ‘উবাদাহ, হাম্মাদ থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন ‘আমর থেকে, তিনি আবূ সালামাহ থেকে, তিনি আবূ হুরাইরাহ থেকে, তিনি নাবী ﷺ থেকে। তিনি ﷺ বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন আজান শোনে, এমতাবস্থায় তার হাতে রয়েছে পানপাত্র, তখন সে যেন ওই পাত্র থেকে নিজের প্রয়োজন সম্পূর্ণ না করার আগে তা রেখে না দেয়।’
আমি আমার পিতাকে বললাম, হাদীসটি রাওহ বর্ণনা করেছেন (ভিন্ন সূত্রে), হাম্মাদ থেকে, তিনি ‘আম্মার বিন আবূ ‘আম্মার থেকে, তিনি আবূ হুরাইরাহ থেকে, তিনি নাবী ﷺ থেকে অনুরূপ হাদীসই বর্ণনা করেছেন। তবে তাতে এই অংশ বাড়তি রয়েছে যে, ‘যখন ফজর উদ্ভাসিত হয়, তখন মুয়াজ্জিন আজান দেয়।’ আমার পিতা জবাবে বলেছেন, এই হাদীস দুটো বিশুদ্ধ নয় (هذان الحديثان لَيْسَا بِصَحِيحَين)। পক্ষান্তরে ‘আম্মারের হাদীস আবূ হুরাইরাহ থেকে মাওকূফ সূত্রে বর্ণিত। আম্মার সিক্বাহ (বিশ্বস্ত), কিন্তু অন্য হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়।” [ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ), আল-মুহাল্লা, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৭১]
আল-‘আল্লামাতুল মুহাদ্দিস মুক্ববিল বিন হাদী আল-ওয়াদি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদীসকে তাঁর লেখা “আহাদীসু মু‘আল্লাহ যাহিরুহাস সিহহাহ (ত্রুটিপূর্ণ হাদীসের সমাহার, বাহ্যিকভাবে যেসবকে সহিহ মনে হয়)”– শীর্ষক গ্রন্থে (পৃ. ৩৬৪; হা/৪৬৮) উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি এ প্রসঙ্গে ইমাম আবূ হাতিম (রাহিমাহুল্লাহ)’র বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
·
দুই. মতন বা মূল টেক্সটের দিক থেকে (হাদীসটি ত্রুটিপূর্ণ)। কেননা উক্ত হাদীস সূরাহ বাক্বারাহর সুস্পষ্ট আয়াতের বিরোধী এবং তার চেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের পরিপন্থি। যেসব বিশুদ্ধ হাদীস বুখারী ও মুসলিম তাঁদের দুই সাহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন ইবনু মাস‘ঊদ, উম্মুল মু’মিনীন ‘আইশাহ, ইবনু ‘উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) প্রমুখের হাদীস। যে হাদীসগুলো প্রমাণ করে, রোজার নিয়ত করেছে এমন ব্যক্তি, যার হাতে খাদ্য বা পানীয় রয়েছে, তার পানাহার থেকে বিরত হওয়ার প্রান্তসীমা হলো ফজর উদয়ের সময়।
‘উলামাদের নিকট এই অর্থই সাব্যস্ত হয়েছে, যখন হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ থাকে। তাহলে তখন ব্যাপারটি কেমন হবে, যখন হাদীসটির সনদও ত্রুটিপূর্ণ?! আমি এই পর্যন্ত প্রাক-পূর্ববর্তী আইম্মায়ে হাদীসের কোনো একজনেরও বক্তব্য পাইনি, উক্ত হাদীসকে বিশুদ্ধ আখ্যানের ব্যাপারে। বরং তাঁদের অধিকাংশের সমঝ (ফিক্বহ) এর বিপরীত। অর্থাৎ তাঁদের মত হচ্ছে, আজান শোনার সাথে সাথে পানাহার থেকে বিরত হওয়া এবং মুখগহ্বরে থাকা খাদ্য ও পানীয় ফেলে দেওয়া ওয়াজিব।
আল্লাহ তাঁদের ওপর রহম করুন। তাঁদের এই সঝম এদিকে ইঙ্গিত করে যে, উক্ত হাদীস তাঁদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়, বরং তা অপ্রমাণিত ও ত্রুটিযুক্ত হাদীস। কিংবা এই হাদীস এভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, ফজর উদয়ের আগেই আজান হয়ে গেলে তখন (উক্ত হাদীসে) আলোচ্য বিধান আমলযোগ্য হবে।
আর সেকারণেই হাফিয বাইহাক্বী আশ-শাফি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদীস বর্ণনা করার পর বলেছেন,
وهذا إنْ صحَّ فهو محمولٌ عند عوام أهل العلم: على أنَّه صلى الله عليه وسلم عَلِم أنَّ المُنادي كان يُنادي قبْل طلوع الفجر، بحيث يَقع شُربُه قُبَيل طلوع الفجر. وقول النبي صلى الله عليه وسلم: (( إِذَا سَمِعَ أَحَدُكُمُ النِّدَاءَ وَالإِنَاءُ عَلَى يَدِهِ ))خبرًا عن النِّداء الأوَّل. ليكون موافقًا لِمَا: أخبرنا أبو عبد الله الحافظ،….، عن عبد الله بن مسعود، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: (( لاَ يَمْنَعَنَّ أَحَدًا مِنْكُمْ أَذَانُ بِلاَلٍ مِنْ سُحُورِهِ، فَإِنَّمَا يُنَادِى لِيُوقِظَ نَائِمَكُمْ وَيَرْجِعَ قَائِمَكُمْ ))، رواه مسلم في “الصحيح” عن إسحاق بن إبراهيم، وأخرجه البخاري مِن أوجْه أُخَر عن التَّيمي. وأخبرنا أبو عبد الله الحافظ،….، عن نافع، عن ابن عمر، وعن القاسم، عن عائشة ــ رضي الله عنهما ــ قالا: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (( إِنَّ بِلاَلاً يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى تَسْمَعُوا أَذَانَ ابْنِ أُمِّ مَكْتُومٍ ))، رواه البخاري في “الصحيح” عن عُبيد بن إسماعيل، ورواه مسلم عن أبي بكر بن أبي شيبة، كلاهما عن أبي أسامة،… فإنْ صحَّ فكأنَّ ابن أمِّ مكتوم وقع تأذينه قبل الفجر، فلم يَمتنع رسول الله صلى الله عليه وسلم مِن الأكل. وعلى هذا الذي ذَكرنا تتفِق الأخبار، ولا تَختلف، وبالله التوفيق.اهـ
“হাদীসটি যদি বিশুদ্ধ হয়, তাহলে অধিকাংশ ‘আলিমের নিকট সেটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, নাবী ﷺ জানতেন, মুয়াজ্জিন ফজর উদয় হওয়ার আগে আজান দেয়। যেহেতু তাঁর পানাহার ফজরের আগেই সম্পন্ন হয়। নাবী ﷺ যে বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ আজান শোনে, আর পানপাত্র তার হাতে থাকে’, তা প্রথম আজান প্রসঙ্গে। যাতে করে এই হাদীস নিম্নোক্ত হাদীসদ্বয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
আমাদের কাছে আবূ ‘আব্দুল্লাহ আল-হাফিয বর্ণনা করেছেন.... ‘আব্দুল্লাহ বিন মাস‘ঊদ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘বিলালের আজান যেন তোমাদেরকে সেহরি খাওয়া থেকে বাধা না দেয়। কেননা সে রাত অবশিষ্ট থাকতেই আজান দেয়, যাতে করে তোমাদের মধ্যে যারা ক্বিয়ামকারী তারা গৃহে ফিরে যায়, আর ঘুমন্ত ব্যক্তিরা জাগ্রত হয়।’ ইমাম মুসলিম হাদীসটি তাঁর ‘সাহীহ’ গ্রন্থে ইসহাক্ব বিন ইবরাহীমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আর ইমাম বুখারী হাদীসটি তাইমী থেকে একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
আমাদের কাছে আবূ ‘আব্দুল্লাহ আল-হাফিয বর্ণনা করেছেন.... নাফি‘র মারফতে ইবনু ‘উমার থেকে, ক্বাসিম হতে বর্ণিত। ‘আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) থেকে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘বিলাল রাত অবশিষ্ট থাকতেই আজান দেয়। সুতরাং ইবনে উম্মে মাকতূমের আজান না শোনা পর্যন্ত তোমরা পানাহার করো।’ ইমাম বুখারী হাদীসটি ‘সাহীহ’ গ্রন্থে ‘উবাইদ বিন ইসমা‘ঈলের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আর ইমাম মুসলিম আবূ বকর বিন শাইবাহ থেকে বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং হাদীসটি যদি সহিহ হয়, তাহলে ধরে নিতে হয়, হয়তো ইবনে উম্মে মাকতূমের আজান ফজরের আগেই হয়ে গেছে। ফলে রাসূলুল্লাহ ﷺ (আজানের পরেও) আহার করা থেকে নিষেধ করেননি। আমাদের উল্লিখিত বিবরণের ওপর ভিত্তি করলেই এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীসসমূহের মাঝে সামঞ্জস্যতা রক্ষিত হয় এবং বৈপরীত্য থেকে বেঁচে থাকা যায়। আর আল্লাহই তৌফিকদাতা।” [হাফিয বাইহাক্বী (রাহিমাহুল্লাহ), সুনানুল কুবরা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২১৮; হা/৮২৭৭-৮২৭৯]
ফাক্বীহ ইবনু হাযম আয-যাহিরী (রাহিমাহুল্লাহ) যখন এ সংক্রান্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করেছেন, তখন তিনি এর পশ্চাতে বলেছেন, هذا كله على أنَّه لم يَكن يتبيَّن لهم الفجر بعد، فبهذا تتفق السُّنن مع القرآن “এগুলোর সবই এ অর্থে যে, তাঁদের নিকটে ফজর প্রকাশিত হয়েছিল না। এর মাধ্যমেই কুরআনের সাথে সুন্নাহর সামঞ্জস্যবিধান করা যায়।” [আল-মুহাল্লা, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৯-৩৭০]
❏ বিশেষ দ্রষ্টব্য:
আমি পূর্বে বলেছি, ‘আমি এই পর্যন্ত প্রাক-পূর্ববর্তী আইম্মায়ে হাদীসের কোনো একজনেরও বক্তব্য পাইনি, উক্ত হাদীসকে বিশুদ্ধ আখ্যানের ব্যাপারে।’ আবূ ‘আব্দুল্লাহ হাকিম (রাহিমাহুল্লাহ) তদীয় ‘মুস্তাদরাক’ গ্রন্থে হাদীসটিকে সহিহ বলার দরুন আমার পূর্বোক্ত কথার ব্যাপারে যেন আপত্তি তোলা না হয়। তাই আমি বলছি, এটা এমন একজনের পক্ষ থেকে সহিহ সাব্যস্তকরণ, যিনি হলেন পরবর্তী মুহাদ্দিস এবং সহিহ বলার ক্ষেত্রে শৈথিল্যবাদী। এমনকি তিনি স্বীয় ‘মুস্তাদরাক’ গ্রন্থে অসংখ্য হাদীসের সনদকে বিশুদ্ধ আখ্যা দিয়েছেন, যেগুলোর কতগুলো জাল, বাজে, খুবই দুর্বল ও দুর্বল হাদীস।
অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে (হা/১৪৭৫৫) বলেছেন, “আমাদের কাছে মূসা হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদের কাছে ইবনু লাহী‘আহ বর্ণনা করেছেন, আবুয যুবাইর থেকে, তিনি বলেন, سألت جابرًا عن الرَّجل يُريُد الصيام والإناء على يَده لِيَشْرَب مِنه، فَيَسْمَع النِّداء، قال جابر: كُنَّا نُحَدَّثُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لِيَشْرَبْ “আমি জাবিরকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যিনি রোজা করার নিয়ত করেছেন, আর তাঁর হাতে পানপাত্র রয়েছে, যা থেকে তিনি পান করতে উপক্রম হয়েছেন, এমন সময় শোনেন, আজান হচ্ছে। তখন জাবির বলেছেন, আমরা হাদীস বর্ণনা করেছি, নাবী ﷺ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, সে যেন পান করে নেয়।”
হাদীসটি সনদ ও মতন—উভয় দিক থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। এর সনদে দুর্বলতা সাব্যস্ত হয়েছে ইবনু লাহী‘আহর কারণে। কেননা সে ত্রুটিপূর্ণ হেফজের অধিকারী (سيء الحفظ)। আর মতন (মূল টেক্সট) সূরাহ বাক্বারাহর সুস্পষ্ট আয়াত আয়াতের বিরোধী এবং তার চেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের পরিপন্থি। যেসব বিশুদ্ধ হাদীস বুখারী ও মুসলিম তাঁদের দুই সাহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন ইবনু মাস‘ঊদ, উম্মুল মু’মিনীন ‘আইশাহ, ইবনু ‘উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) প্রমুখের হাদীস। যে হাদীসগুলো প্রমাণ করে, রোজার নিয়ত করেছে এমন ব্যক্তি, যার হাতে খাদ্য বা পানীয় রয়েছে, তার পানাহার থেকে বিরত হওয়ার প্রান্তসীমা হলো ফজর উদয়ের সময়।