27/01/2026
হৃদয়ের Critical Point
লেখা : Shyama
★অধ্যায় দুই
—
—
বিকেলের আলোটা ঢাকার আকাশে কখনোই নিখুঁত হয় না। ধোঁয়া, কোলাহল আর সময়ের তাড়াহুড়ো মিশে আলোকে খানিকটা ক্লান্ত করে তোলে। তবু সেই বিকেলেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরোনো ভবনটার করিডোরে একধরনের স্থিরতা নেমে আসে—যেন দিনটা হঠাৎ করে নিজের গতি কমিয়ে দেয়।
অর্ণব গুপ্তা হাতের ফাইলটা বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। সকাল থেকে টানা কাজের পর মাথার ভেতর একটা ভারী অনুভূতি জমে আছে। রোগীর মুখ, উপসর্গ, রিপোর্ট—সব মিলিয়ে একটা অভ্যস্ত যান্ত্রিকতা। অথচ আজকের দিনটা অন্যরকম লাগছিল। ঠিক কেন, সে নিজেও নিশ্চিত না।
সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, রোগীদের আত্মীয়দের উৎকণ্ঠিত পায়চারি—সবই প্রতিদিনের দৃশ্য। কিন্তু তার চোখ অকারণেই ভিড়ের ভেতর কিছু খুঁজছিল। ❝কোনো নির্দিষ্ট মুখ নয়, কোনো পরিচিত অবয়বও নয়—শুধু একটা অনুচ্চারিত প্রত্যাশা।❞
ঠিক তখনই পাশের বেঞ্চে বসে থাকা একজন নার্স বলে উঠলেন
— ডা. অর্ণব স্যার, নতুন এক রোগী এসেছে। একটু জটিল কেস।
অর্ণব চমকে উঠল। বাস্তবতা আবার তাকে টেনে নিল নিজের ভেতরে। সে মাথা নেড়ে ফাইল হাতে এগিয়ে গেল।
একই বিকেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সেমিনার রুমে হৃশিতা সেন একা বসে ছিল। ❝সাদা বোর্ডে চক দিয়ে লেখা অর্ধসমাপ্ত সমীকরণগুলো তার দিকে তাকিয়ে আছে—প্রশ্নের মতো, অভিযোগের মতো।❞
সে আবার বোর্ডের দিকে তাকাল।
সব ঠিক আছে।
তবু ঠিক হচ্ছে না।
হৃশিতা চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতর সকালবেলার সেই ঘটনাটা অযাচিতভাবে ভেসে উঠল—মেডিকেল কলেজের করিডোর, সাদা অ্যাপ্রোন, শান্ত কণ্ঠস্বর।
-আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?
কেন জানি কণ্ঠটা সে ভুলতে পারছে না। অথচ এই মানুষটার সঙ্গে তার জীবনের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। সে নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হলো।
— ফোকাস, হৃশিতা!
সে ফিসফিস করে বলল।
ঠিক তখন দরজা খুলে ঢুকলেন অধ্যাপক শৌভিক মুখার্জি। ষাট ছুঁইছুঁই বয়স, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, আর হাঁটার ভঙ্গিতে একধরনের ধীর আত্মবিশ্বাস।
— একা বসে আছো?
— জি স্যার।
অধ্যাপক বোর্ডের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর বললেন,
— সমস্যাটা সমীকরণে না। সমস্যাটা তুমি যেভাবে ভাবছো, সেখানে।
হৃশিতা কিছু বলল না। সে জানে, স্যার ঠিকই ধরেছেন।
— অনেক সময়.....(অধ্যাপক ধীরে বললেন) সমাধান আটকে যায় কারণ আমরা ধরে নিই—এই পথটাই একমাত্র সঠিক পথ। অথচ সমাধানটা থাকে একটু বাঁকে।
হৃশিতা মৃদু হাসল।তারপর বলল,
— Critical Point-এর মতো?
অধ্যাপক বললেন,
-ঠিক তাই।
স্যার চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার নীরব হলো। হৃশিতা বোর্ডের লেখা মুছল না। শুধু ব্যাগটা কাঁধে তুলে বেরিয়ে পড়ল। আজ আর হিসাব নয়।বড্ড মাথা ধরেছে।
সন্ধ্যার ঢাকায় বৃষ্টি নামল আচমকা। হালকা, কিন্তু অবিরাম। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় বেড়ে গেল। অর্ণব তখন একের পর এক রোগী দেখছে। ভেজা কাপড়, ভেজা চুল, আতঙ্কিত চোখ—সব মিলিয়ে একটা বিশৃঙ্খল দৃশ্য।
ঠিক তখনই একজন মধ্যবয়সী লোক ছুটে এলো।
— ডাক্তার! আমার মেয়েটা—হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে!
অর্ণব দ্রুত স্ট্রেচারের দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটির মুখে অচেতনতার ছাপ, কপালে ঘাম।
অর্ণব রোগীর ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করতে করতে পরীক্ষা শুরু করল। ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন,
— আজ সারাদিন না খেয়েই ছিল। পরীক্ষার টেনশন…
অর্ণব এক মুহূর্ত থমকাল।
এই দৃশ্যটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগল। ❝যেন সে আগেও এমন কাউকে দেখেছে—নিজের ভেতরের কোনো স্মৃতিতে।❞
রোগীকে ওয়ার্ডে পাঠানো হলো। পরিস্থিতি সামলে উঠল। অর্ণব হাত ধুতে ধুতে হঠাৎ অনুভব করল—সে ভীষণ ক্লান্ত। শুধু শরীর নয়, মনও।
হাসপাতালের ছাদের দিকে উঠে গেল সে। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। ঢাকার আলো ঝাপসা হয়ে আছে। অর্ণব রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
সে ধরল।
— “হ্যালো?”
ওপাশে একটু থেমে গিয়ে বলল,
—আপনি অর্ণব বলছেন?
অর্ণব কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
- হ্যাঁ।কিন্তু আপনি?ঠিক চিনলাম না!
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
- আমি…আমি হৃশিতা!ঐ যে আজ সকালে যে পথ ভুল করে, ভুল ভবনে চলে গেছিল। আপনি যাকে পথ দেখিয়েছিলেন.....
অর্ণব কিছু একটা ভাবতেই তার মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠলো। তারপর বলল,
- আমার নাম্বারটা কোথায় পেলেন?
হৃশিতা বলল,
— ও হ্যাঁ। আসলে,ঐ সময় আপনার হাত থেকে ফাইল পরে গেলো না? আমি ভুল করে তখন আপনার কার্ডটাই ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছিলাম। এখন খেয়াল করলাম।কার্ডে আপনার নাম্বার দেওয়া ছিল।তাই মনে হলো, আপনাকে জানানো উচিত। আপনি কিছু মনে করলেন না তো?
অর্ণব জানত না কী বলবে। বৃষ্টি আর শহরের শব্দের মাঝে মুহূর্তটা হঠাৎ করে এতটা স্নিগ্ধ লাগছে কেন?
অর্ণব কিছুটা হেসে বলল,
- কি আর মনে করবো?আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আপনার কাছে রয়ে গেল,আর আপনি সেটা দায়িত্ব মনে করে আমাকে জানালেন, আমার তো বরং আপনার উপর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হৃশিতা বলল,
- কি যে বলেন! ভুল তো আমারই ছিলো।তার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত। কার্ডটা কিভাবে আপনাকে ফেরত দিতে পারি?
অর্ণব কিছু একটা ভেবে বলল,
- যদি কিছু মনে না করেন তবে, আজকে যে ভবনে আমাদের দেখা হয়েছিল, সেখানে আসলেই...... যদি আপনার কোনো অসুবিধা না থাকে তো!
হৃশিতা মুচকি হেসে বলল,
- পাশাপাশিই তো! যেতে আর কতক্ষণ! আজ রাখি তাহলে?
অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
- ঠিক আছে। ভালো থাকবেন।
কথোপকথনটা খুব ছোট ছিল। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই। তবু কলটা কেটে যাওয়ার পর অর্ণব অনেকক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
নিচে শহর চলছে। মানুষ চলছে। সময় চলছে।
আর কোথাও, অদৃশ্য কোনো বিন্দুতে, দুটো জীবন খুব ধীরে একে অপরের দিকে বাঁক নিচ্ছে—
❝ঠিক যেমন গণিতের একটি Critical Point-এ,
যেখানে দিক পরিবর্তন হয় নিঃশব্দে,
কিন্তু প্রভাব থাকে দীর্ঘস্থায়ী।❞
এই গল্প সেখান থেকেই আস্তে আস্তে নিজের পথ খুঁজে নিতে শুরু করে।