17/06/2026
কবচ, তিলিসমাত এবং হুরুফিয়াত
মুসলিমদের ব্যবহৃত কবচ এবং তিলিসমাতি বস্তুগুলোতে এমন সব জাদুকরী প্রতীক দেখা যায় যেগুলোর উৎস ইসলাম-পূর্ব ঐতিহ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবুও এই সকল নিদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে করা বিশেষ আকুতি। এই দিক থেকে সেগুলো বাইজান্টাইন, রোমান বা প্রাচীন ইরানি জাদুর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
তিলিসমাত এবং কবচ কেবল বদনজর বা দুর্ভাগ্য এড়াতেই ব্যবহৃত হতো না বরং সৌভাগ্য অর্জন, উর্বরতা বৃদ্ধি, সক্ষমতা কিংবা আকর্ষণ বাড়ানোর কাজেও লাগানো হতো। এগুলোতে জাদুকরী চিহ্নের পাশাপাশি এমন সব প্রার্থনা থাকত যা সরাসরি আল্লাহর প্রতি নিবেদিত। কবচের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত আরবি শব্দ হলো তিলসাম (تلسّم) এবং হিরজ (حرز) যা মূলত সুরক্ষা নির্দেশ করে। তিলসাম শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ কোনো বস্তুকে আধ্যাত্মিক শক্তি দান করা। ইসলামি বিশ্বের জাদুকরী আহ্বানের সাথে ইউরোপীয় পদ্ধতির মূল পার্থক্য হলো এখানে জিন বা শয়তানের পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। যদিও এই সকল বস্তুতে কিছু জাদুকরী লিপি বা হুরুফিয়াত থাকে তবে সেগুলো মূলত বহনকারীকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কাছে করা বিশেষ ফরিয়াদ। মাইকেল ডলস ইসলামি জাদুকে এক ধরণের শক্তিশালী প্রার্থনা হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো এই দাবিকেই সমর্থন করে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইসলামি জাদু প্রাচীন এবং ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় প্রথা থেকে ভিন্নতর।
জাদুকরী বস্তুগুলোতে ব্যবহৃত প্রার্থনা, কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণবাচক নাম (আসমাউল হুসনা) কিংবা ফেরেশতাদের নামের সাথে বিভিন্ন প্রতীকের সমন্বয় ঘটানো হতো যাতে ফরিয়াদ আরও শক্তিশালী হয়। এই প্রতীকগুলোর অনেকগুলোই প্রাচীন সংস্কৃতি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং সময়ের পরিক্রমায় এগুলোর প্রকৃত উৎস ও তাৎপর্য বর্তমানে অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।
আদিমতম টিকে থাকা তিলিসমাতি বস্তুগুলোতে ইসলাম-পূর্ব জাদুকরী প্রতীকবাদের প্রতিফলন দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ নবম শতাব্দীর প্রাচীন ইরানি কবচগুলোতে দীর্ঘ শিংওয়ালা হরিণ বা ওরিক্সের চিত্র পাওয়া যায়। এছাড়া নবম ও দশম শতাব্দীর কবচগুলোতে একটি অত্যন্ত স্থিতিশীল অথচ জটিল নকশা দেখা যায় যা বৃশ্চিক, লাফিয়ে পড়া সিংহ বা কুকুর, নক্ষত্রখচিত চাঁদোয়া এবং ছদ্ম-লিপির একটি কাঠামো দিয়ে গঠিত। অজ্ঞাত কারণে দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে তিলিসমাতের ভাণ্ডার থেকে এই উভয় নকশা হারিয়ে যায় এবং তখন অন্য ধরণের নকশাগুলো প্রাধান্য পেতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ের নকশাগুলোর মধ্যে সাতটি জাদুকরী চিহ্নের একটি সারি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। এই সারিতে একটি পাঁচ কোণা তারকা বা পেন্টাগ্রাম থাকে যাকে অনেক সময় ছয় কোণা তারকা হিসেবেও দেখা যায়।
ঐতিহাসিকভাবে একে সুলায়মানি সীলমোহর (خاتم سليمان) বলা হয়। এই সাতটি জাদুকরী প্রতীক একত্রে পরম করুণাময়ের পবিত্র নামের সংকেত হিসেবে গণ্য হতো। যদিও ইতিহাসবিদগণ ভুলবশত অনেক সময় একে সুলায়মানের সাত সীলমোহর বলে অভিহিত করেছেন। তিলিসমাতের নকশায় প্রাচীনকাল থেকে প্রাপ্ত জ্যোতিষশাস্ত্রীয় চিত্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এগুলো সাধারণত রাশিচক্রের বারোটি চিহ্ন এবং সাতটি প্রাচীন গ্রহের মানবিক রূপ যা ইসলামি চিত্রশৈলীর আদলে তৈরি করা হতো।
সংখ্যা ও হুরুফিয়াত এবং অন্যান্য চিহ্ন দিয়ে গঠিত জাদুকরী লিপি তিলিসমাতের আরও একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। নবম শতাব্দীর শুরু থেকেই জাদুকরী বর্ণমালা, গোপন লিপি এবং প্রাচীন সংস্কৃতির অদ্ভুত বর্ণমালার ওপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র রচিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইবনে ওয়াহশিয়া জাদুকরী লিপির ওপর একটি সচিত্র প্রবন্ধ রচনা করেন। প্রাচীন প্রতীকগুলোর পাঠোদ্ধার নিয়ে দশম শতাব্দীতে জাফর ইবনে মনসুর আল-ইয়ামান একটি গবেষণাপত্র লেখেন যা প্রাচীন গুপ্ত প্রতীক সম্পর্কে জানার জন্য একটি কার্যকর নির্দেশিকা। আদি ও পরবর্তী সময়ের ইসলামি জাদুকরী শব্দভাণ্ডারে এমন কিছু প্রতীক অন্তর্ভুক্ত ছিল যা প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এগুলো মূলত ছোট ছোট রেখার সমন্বয়ে গঠিত যার শেষ প্রান্তগুলো গোল করে পেঁচানো থাকে। হুরুফিয়াতের নিজস্ব জাদুকরী গুণাবলী ব্যবহার করে অনেক সময় জিনদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
ইসলামি তিলিসমাতের অগণিত প্রতীকের পাঠোদ্ধার করার জন্য তৌফিক কানানের গবেষণাটি আজও সেরা নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত। সম্প্রতি ভেনেশিয়া পোর্টার ইসলামি সীলমোহর নিয়ে একটি পরীক্ষা প্রকাশ করেছেন যেখানে কবচের নকশাগুলো উল্টো করে খোদাই করা হয়েছে যেন সেগুলো দিয়ে ছাপ দেওয়া যায়। এতে তিনি সীলমোহর (خاتم) ও কবচের মধ্যকার অস্পষ্টতা এবং উভয়ের কাজ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এইচ.এ. উইঙ্কলারের গবেষণাটি আজও প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে জর্জেস আনাওয়াতি উত্তর আফ্রিকার কিছু কবচের নির্দেশনাবলী বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে একটি চমৎকার গ্রন্থপঞ্জি প্রদান করেছেন। টিকে থাকা অনেক কবচে পাঠোদ্ধার অযোগ্য ছদ্ম-আরবি লিপির উপস্থিতি ইতিহাসবিদদের মনে কিছু কৌতূহলজনক প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। এই শব্দগুলো কি লেখকের কাছেও অর্থহীন ছিল? লেখক কি অশিক্ষিত ছিলেন এবং নিজের আদর্শ লিপিটি বুঝতে ভুল করেছিলেন? যদি তাই হয় তবে কি এই ভুল জাদুকরী ক্ষমতা বা আহ্বানের শক্তিকে কমিয়ে দেয় কিংবা অকার্যকর করে দেয়? যদি তিলিসমাত বহনকারী ব্যক্তি বা আহ্বান পাঠকারী সেই বিশেষ সূত্রটি বুঝতে না পারেন তবে কি জাদুর কার্যকারিতা নষ্ট হয়?
তিলিসমাতি সুরক্ষা মূলত সব কিছুর জন্যই চাওয়া হতো। উদাহরণস্বরূপ পাণ্ডুলিপিগুলোকে প্রায়ই ইয়া কাবিকাজ (يا كبيكج) নামক একটি সাধারণ বাক্য লিখে সংরক্ষিত করা হতো। এই তিলিসমাতি লিপিতে কোনো জাদুকরী প্রতীক ছিল না বরং এটি একটি বিশেষ ধারণাকে প্রতিফলিত করত। কাবিকাজ হলো রেনানকুলাসি পরিবারের একটি অত্যন্ত বিষাক্ত উদ্ভিদ যা কীটপতঙ্গ এবং কৃমি তাড়াতে কার্যকর। আরব্য পাণ্ডুলিপি তৈরিতে মাছের আঠা এবং স্টার্চের আঠার ব্যবহার বইয়ের দিকে নানা ধরণের কৃমি ও কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করত। দেখা গিয়েছে যখন প্রকৃত গাছটি পাওয়া যেত না তখন কেবল কাবিকাজ নামটি একটি আহ্বানের ঢঙে বইয়ের শুরুতে এবং শেষে লিখে রাখা হতো যেন তা কীটপতঙ্গের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে। এই সকল ক্ষেত্রে আহ্বানটি আল্লাহ বা কোনো মধ্যস্থতাকারী কিংবা কোনো ক্ষুদ্র দেবতার প্রতি নয় বরং উদ্ভিদের নিজস্ব গুপ্ত গুণাবলী বা খাওয়াস এর প্রতি নিবেদিত হতো।
বইঃ জাদুবিদ্যা (ইতিহাস, তত্ত্ব, নকশা, সাধনা এবং ইমাম তাইমিয়ার ব্যাখ্যা)
জনরাঃ ইসলামিকেট
লেখকঃ কাজী ম্যাক
অনুজ প্রকাশন/Anuj Prokashon
বইটি প্রি-অর্ডার করতে যোগাযোগঃ আমাদের পেইজে
প্রি-অর্ডার মূল্য - ৫৬০ টাকা