02/07/2025
অপূর্ণতা (অণুগল্প)
-তৌফিক আল ইমরান
বিসিআইসি কলেজের সুনশান করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল জান্নাতুল ফেরদৌস নওরিন। ক্লাস শেষ হলেও কলেজের বাগানে বসে থাকা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তার। সেদিনই প্রথম তারেকের সঙ্গে দেখা। তারেক, কলেজের সিনিয়র, সবার কাছে জনপ্রিয় একজন। শার্টের হাতা গুটানো, কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো, এবং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি—তাকে দেখে নওরিনের চোখ আটকে গিয়েছিল।
তাদের আলাপটা হয়েছিল এক সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে। নওরিন লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে বের হচ্ছিল, হঠাৎ তারেক তাকে বলল,
“এই বইটা তুমি পছন্দ করো?”
নওরিন প্রথমে থমকে গিয়েছিল। কিন্তু তারেকের চোখের উষ্ণতায় সাড়া দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমার প্রিয় বই।”
এরপর থেকে তাদের মাঝে আলাপ বাড়ল। ক্লাসের ফাঁকে ক্যান্টিনে চা খাওয়া, কলেজের পেছনের গাছতলায় বসে গল্প করা—নওরিন যেন তারেকের সান্নিধ্যে নিজেকে অন্যরকম মনে করত।
তারেক ছিল সহজাত এক রোমান্টিক। একদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে নওরিনকে বলল,
“তোমার চুলের কায়দাটা ঠিক নদীর ঢেউয়ের মতো। আমি হারিয়ে যাই তোমার ওই ঢেউয়ে।”
নওরিন একটু লজ্জা পেলেও তার মনের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠেছিল।
এইভাবেই গড়ে উঠেছিল তাদের প্রেম। তাদের সম্পর্কটা যেন ছিল নিখুঁত, একে অপরকে বোঝার আর ছোট ছোট মুহূর্তে সুখ খুঁজে নেওয়ার এক অনন্য যাত্রা।
তবে সম্পর্কটা যত গভীর হচ্ছিল, তারেক ততই উদাসীন হয়ে উঠছিল। নওরিন যখন তারেকের সঙ্গে দেখা করতে চাইত, তারেক প্রায়ই বলত,
“তুমি এত পজেসিভ কেন? আমাকে একটু সময় দাও নিজের জন্য।”
তারেকের ফোনের উত্তর দিতে দেরি করা, কথায় অবহেলা করা—সবকিছু নওরিনকে কষ্ট দিতে শুরু করল।
একদিন সে তারেককে বলল,
“তুমি কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না?”
তারেক বিরক্তির সুরে উত্তর দিল,
“তুমি সবকিছু এত সিরিয়াসলি নিও কেন? এটা তো কলেজের প্রেম, জীবন নিয়ে এত চাপ নিও না।”
নওরিনের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা চূর্ণ হয়ে গেল। সে বুঝল, তারেকের কাছে এই সম্পর্ক আর তেমন গুরুত্ব রাখে না।
অবশেষে নওরিন নিজেই সম্পর্কটা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিল।
“যে মানুষ আমাকে আমার নিজের মতো করে বুঝতে পারে না, তার সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়,”—নিজের মনের সঙ্গে কথা বলেছিল সে।
তারেক এই বিচ্ছেদকে খুব একটা গুরুত্ব দিল না প্রথমে। তার ভাবনায়, এটা সাময়িক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে পারল, নওরিনই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
তারেক বহুবার নওরিনকে মেসেজ করল, ফোন করল।
“আমি ভুল করেছি, আমাকে একটা সুযোগ দাও,”—তারেক লিখেছিল।
কিন্তু নওরিন তাকে সোজাসাপ্টা উত্তর দিল,
“যে মানুষ সময় থাকতে মূল্যায়ন করতে পারে না, তার এখন বুঝলেও তাতে কিছু যায় আসে না।”
নওরিন এই কথা বললেও, মাঝেমধ্যে তার মনটা দুর্বল হয়ে যেত। রাতের নিস্তব্ধতায় সে তার ফোনে তারেকের পুরোনো ছবি দেখত, স্মৃতির গভীরে ডুবে যেত, চোখ থেকে জল গড়াতো।
বছর গড়িয়ে গিয়েছে। নওরিন এখন তার গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। কিন্তু চাকরি খুঁজতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতা তার মনকে ভারী করে তোলে।
“কবে একটা ভালো চাকরি পাব? সবাই কেবল একথাই বলে,”—নিজের মনের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।
তার পরিবারও তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আনে।
“তোমার বয়স তো হচ্ছে, এবার বিয়ে করো,”—মা প্রায়ই বলতেন।
নওরিন নিজেও ভেবে নেয়, হয়তো বিয়ে করেই নতুন জীবনে সুখ খুঁজে পাবে। তারেককে নিয়ে যে স্বপ্নগুলো একসময় দেখেছিল, এখন সে চায় সেগুলো নতুন কারও সঙ্গে বাস্তবায়িত করতে, অন্য কাউকে নিয়ে নতুন করে জীবন সাজাতে। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছাটা তার এখনো বেঁচে আছে।
তারেক আজও অপেক্ষায় থাকে। সে ভাবে, একদিন হয়তো নওরিন ফিরে আসবে। কিন্তু নওরিন আর ফিরে যায় না।
তারেকের মেসেজগুলো অদেখা থেকে যায়, কখনওবা দীর্ঘ সময়ের পরে দেখে। নওরিন তার নিজের জন্য নতুন স্বপ্ন গড়ে তোলে, যদিও তার ভেতরে লুকানো কিছু বিষাদের সুর মাঝে মাঝে মনে বেজে ওঠে।
জীবনের বাস্তবতা এবং অতীতের কষ্ট একসঙ্গে মিশে গিয়ে নওরিনকে শক্ত হতে শিখিয়েছে। নওরিন জানে, অতীতের দুঃখ ভুলে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তারেকের সঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলো এখনো তাকে মাঝে মাঝে বিষণ্ন করে তোলে।
সে জানত, তারেককে সে ভালোবেসেছিল, কিন্তু নিজের আত্মসম্মানের কাছে সে কখনোই আপস করবে না।
তারেক তার ভালোবাসার মানুষকে ফিরে পাওয়ার জন্য সবকিছু করল। কিন্তু নওরিন আর ফিরে এল না। সে নিজের কষ্টকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলল।
নওরিন জানত, কিছু সম্পর্ক কষ্ট দিয়ে যায়, কিন্তু সেই কষ্ট থেকেই নতুন জীবনের পথ তৈরি হয়।