28/10/2024
"শেষ ভাল যার সব ভাল তার " ইসলামের ইতিহাসে
"শেষ ভাল যার সব ভাল তার" প্রবাদটি ইসলামের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। অসংখ্য ব্যক্তি, যারা একসময় ইসলামের বিরুদ্ধে ছিলেন, পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এ ধরনের চরিত্রগুলো আমাদের দেখায় যে, তাদের পথচলা হয়তো সংঘর্ষ দিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু শেষটা ইসলামের জন্য অবদান রেখে গিয়েছিল—যদিও সবার জন্য তা ইতিবাচক হয়ে উঠেনি। এখানে তিনটি চরিত্রকে নিয়ে আলোচনা করা হলো, যাদের জীবনের পথচলা এই প্রবাদটির প্রকৃত অর্থকে ফুটিয়ে তোলে।
১. উমর ইবনে খাত্তাব: শত্রু থেকে ন্যায়পরায়ণ নেতায় রূপান্তর
উমর ইবনে খাত্তাব শুরুতে ইসলামের অন্যতম কঠিন বিরোধী ছিলেন। এমনকি তিনি একদিন নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করতে বের হয়েছিলেন, কারণ তিনি মনে করতেন এতে তার জাতির ঐক্য ফিরবে এবং ইসলামের প্রসার থেমে যাবে। তবে পথে তিনি কোরআনের আয়াত শুনে অভিভূত হন। এই অভিজ্ঞতা তাকে ইসলামের দিকে ধাবিত করে এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানরা এক নতুন শক্তি পায়। সাহসী, দৃঢ়চেতা উমর দ্রুতই নবীজীর (সা.) ঘনিষ্ঠ সাহাবী হয়ে ওঠেন।
উমরের শাসনামলে, দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে তার অবদান কিংবদন্তি হয়ে আছে। তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেন এবং ইসলামি সাম্রাজ্যকে সম্প্রসারিত করেন। তার রূপান্তর প্রকৃতপক্ষে "শেষ ভাল যার সব ভাল তার" এই কথাটির প্রকৃত উদাহরণ, কারণ শুরুতে ইসলামের বিরোধী হলেও, শেষমেশ তিনি ইসলামের জন্য আজীবন কাজ করেছেন।
২. খালিদ ইবনে ওয়ালিদ: পরাজিতকারী থেকে আল্লাহর তরোয়াল
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ছিলেন একজন অসাধারণ সামরিক কমান্ডার, যিনি প্রথমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং ওহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজিত করেন। তার কৌশলী নেতৃত্বে মুসলিমরা ওহুদ যুদ্ধে পরাজিত হয়, যা অনেক সাহাবীর শাহাদাতের কারণ হয়। কিন্তু খালিদের ইসলামের সাথে সম্পর্ক এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
ইসলাম গ্রহণের পর খালিদ তার সামরিক দক্ষতাকে ইসলামের জন্য কাজে লাগান। নবীজী (সা.) তাকে "সাইফুল্লাহ" বা "আল্লাহর তরোয়াল" উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তিনি বহু যুদ্ধে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করেন। তার রূপান্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যারা একসময় ইসলামের বিরোধী ছিলেন, তারাই পরবর্তীতে ইসলামের অন্যতম প্রধান রক্ষক হয়ে উঠতে পারেন। তার জীবন শেষ হয়েছে সম্মান ও মর্যাদার সাথে।
৩. ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া: ইসলামের ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায়
ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া ইসলামের ইতিহাসে একটি জটিল চরিত্র। তরুণ সেনাপতি হিসেবে তিনি মুসলিমদের প্রাথমিক সম্প্রসারণে অবদান রেখেছিলেন এবং কনস্টান্টিনোপলে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার সামরিক ভূমিকা শুরুতে মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তৃতিতে সহায়ক ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে ইয়াজিদের কাজ তার খ্যাতিকে কালিমালিপ্ত করে। বিশেষ করে কারবালার ঘটনায় ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদাতের সাথে তার জড়িত থাকা তার নামে কলঙ্কের দাগ ফেলে। ইমাম হোসাইনের শাহাদাত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, আর ইয়াজিদকে ইসলামের ইতিহাসে অন্যায়ের প্রতিভূ হিসেবে দেখা হয়। উমর ও খালিদের মতো তার জীবন সম্মানজনক পরিসমাপ্তি পায়নি, বরং ইসলামী ইতিহাসে তাকে একটি অভিশপ্ত হিসেবে মনে করা হয়।
উপসংহার
উমর ইবনে খাত্তাব ও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ প্রমাণ করেছেন যে, যারা একসময় ইসলামের বিরোধী ছিলেন, তারাই ইসলামকে উন্নীত করতে আজীবন কাজ করতে পারেন। ইয়াজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, ন্যায়পরায়ণতা এবং মমত্ববোধ ছাড়া কোনো কাজের শেষ পরিণতি ভাল হয় না। ইসলামের ইতিহাসে এসব ঘটনা আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন তার শেষ অধ্যায়ে এবং আমরা কীভাবে সেই অধ্যায় রচনা করি।
আল্লাহ আমাদের শুরু এবং শেষটাকে ভালো রাখুন ... আমিন